
সমাজে অল্প কিছু মানুষের হাতে দেশের অধিকাংশ সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। অগ্রহণযোগ্য মাত্রায় পৌঁছে যাওয়া এই আকাশচুম্বী বৈষম্য দূর করতে হলে নীতিগত বিকল্প খোঁজার সময় এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের বঞ্চিত শ্রেণির মানুষের স্বার্থ রক্ষায় করপোরেট মালিকানার একটি নতুন মডেল প্রণয়ন করা জরুরি, যার আওতায় করপোরেট খাতের মালিকানায় শ্রমিকদেরও অংশীদারত্ব থাকবে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘সৈয়দ হুমায়ুন কবীর স্মৃতি গবেষণা সম্মেলন ২০২৬’ অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশন ও সাজেদা ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বটি ‘ন্যায্যতা, সক্ষমতা ও জীবনকুশলতা’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। এই পর্বে স্বাগত বক্তব্য দেন বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ জাভেদ চৌধুরী। এ ছাড়া সূচনা বক্তব্য দেন সাজেদা ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ফারুক সোবহান ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা উপদেষ্টা সাজেদা আমিন। অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সম্মানিত অধ্যাপক ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু অনলাইন মাধ্যমে যুক্ত হয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, সম্পদের মালিকানাকে সাধারণ মানুষের মাঝে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। তিনি এমন এক মডেল গ্রহণের ওপর জোর দেন যেখানে শ্রমিকরা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় অংশীদার হতে পারবেন, যা সমাজের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে মালিকানার অধিকার এনে দেবে। রেহমান সোবহান সতর্ক করে বলেন, যতদিন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ে এই ভাবনার গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া না হবে, ততদিন আমাদের এই বৈষম্যমূলক ও অন্যায্য পৃথিবীতেই বাস করতে হবে। এর ফলে কেবল অর্থনৈতিক ক্ষমতাই নয়, রাজনৈতিক ক্ষমতাও গুটিকয়েক মানুষের হাতে বন্দি থাকবে।
অনলাইন বক্তব্যে অধ্যাপক কৌশিক বসু বলেন, বর্তমানে সমাজ এক অভাবনীয় সন্ধিক্ষণ পার করছে, যা মানব ইতিহাসে বিরল। হাতে গোনা কিছু মানুষের নিয়ন্ত্রণে বিপুল সম্পদ চলে যাওয়ায় বৈষম্য এখন সীমাহীন। এই ধারা রুখতে নতুন নীতিগত বিকল্প নিয়ে চিন্তা করা প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সাম্প্রতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, এআই-এর কারণে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত শ্রমের চাহিদা কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশে যেখানে সিংহভাগ মানুষ কায়িক শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে, সেখানে এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন উদ্বেগজনক সংকট তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্ঞান, নৈতিক চেতনা, সামাজিক উদ্যোগ, গবেষণা ও সামাজিক সক্রিয়তাকে সামনের সারিতে নিয়ে আসতে হবে।
অনুষ্ঠানে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রয়াত সৈয়দ হুমায়ুন কবীরকে স্মরণ করে বলেন, মানুষের সামগ্রিক কল্যাণের ব্রত নিয়ে টিআইবি প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। তবে দেশকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা আজও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। দেশে এখনও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জোরালো লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এই প্রথম পর্বের আলোচনায় আরও অংশ নেন সাজেদা ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ফারুক সোবহান ও উপদেষ্টা শেহজাদ মুনিম। পর্বটি সঞ্চালনা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাশনা ইমাম।
সম্মেলনের পরবর্তী পর্ব ‘আগামীর জন্য নির্মাণ: প্রতিষ্ঠান, উদ্ভাবন ও গুণগতমান’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নিয়ে মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করে বলেন, অবহেলিত ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ হলো তাঁদের সচেতন করা। তারা কখন সাহায্যের জন্য আসবে সেই অপেক্ষায় না থেকে অধিকারকর্মীদেরই তাঁদের কাছে যেতে হবে। অতীতে তালতলা বস্তি উচ্ছেদের সময় আসকের কর্মীরা সরাসরি মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন এবং তাঁদের প্রকৃত চাহিদাগুলো চিহ্নিত করে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
এই পর্বে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) ইমেরিটাস বিজ্ঞানী ড. ফিরদৌসী কাদরী দেশের বিজ্ঞান ও উন্নয়ন কাঠামোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে প্রয়োজনীয় অর্থের অভাব যেমন রয়েছে, তেমনি বিজ্ঞানের কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে ভাবনার ঘাটতি এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনারও দুর্বলতা রয়েছে। উদ্ভাবন নিয়ে প্রচুর কথাবার্তা হলেও আসলে কী উদ্দেশ্যে তা করা হচ্ছে, সেটি অনেক সময় অস্পষ্ট থাকে। তিনি তাঁদের দীর্ঘদিনের ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন উন্নয়ন গবেষণার উদাহরণ দিয়ে বলেন, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মানুষের জন্য এই টিকা তৈরি করাই শুধু শেষ কথা নয়, সেটি কীভাবে সহজ উপায়ে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যায় এবং সফলভাবে প্রয়োগ করা যায়, তা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয় পর্বের আলোচনায় আরও অংশ নেন পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী এবং রেনাটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ এস কায়সার কবির, যিনি প্রয়াত সৈয়দ হুমায়ুন কবীরের ছেলে। এই পর্বটি সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক ফারাবী হাফিজ। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ হুমায়ুন কবীরের স্ত্রী ও সাজেদা ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষক সাজেদা হুমায়ুন কবির, তাঁদের দুই কন্যা সাজেদা ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাহেদা ফিজ্জা কবির এবং লিগ্যাল, সোশ্যাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইন্টেগ্রিটির জ্যেষ্ঠ পরিচালক সাজেদা ফারিসা কবির। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি আরও বলেন, বহু বছর আগে তাঁরা পরীক্ষামূলকভাবে ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ শুরু করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ব এমন এক সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার মতো পরিস্থিতি আমরা খুব কমই দেখেছি।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যখন তালতলা বস্তি উচ্ছেদের ঘটনা ঘটে, মাঠকর্মীরা তাঁদের কাছে যেতেন, কী ঘটেছে তা নথিবদ্ধ করতেন, প্রমাণ সংগ্রহ করতেন এবং তাঁরা কী ধরনের সহায়তা চান বা কী প্রয়োজন, তা বোঝার চেষ্টা করতেন।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
সূত্র: প্রথম আলো