
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এক বছরের সভাপতিত্বের মেয়াদে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর হারিয়ে যাওয়া আস্থা পুনরুদ্ধার করাকে নিজের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন বাংলাদেশের শীর্ষ কূটনীতিক ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি মনে করেন, ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময় যে প্রত্যাশা ছিল, বর্তমানে তা অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব হয়নি। সংস্থাটির কার্যকারিতা ও প্রত্যাশার মাঝে বিদ্যমান এই ব্যবধান ঘোচানোর ওপর তিনি বিশেষ জোর দিচ্ছেন।
বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে জাতিসংঘের হাই-লেভেল সপ্তাহ শুরু হয়েছে। এই সময়টিকে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের বিশ্বনেতাদের সবচেয়ে বড় মিলনমেলা হিসেবে গণ্য করা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের হাই-লেভেল সপ্তাহে যোগদানের প্রেক্ষাপটে ইউএন নিউজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. খলিলুর রহমান বিশ্বসংস্থাটির সংস্কার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর চ্যালেঞ্জ এবং রোহিঙ্গা সংকটের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
ড. খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসংঘে আমূল ও অতি প্রয়োজনীয় সংস্কার এখন সময়ের দাবি। তিনি উল্লেখ করেন যে, সাধারণ পরিষদের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থা কাটানো এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। মানবাধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তিনি জানান, জাতিসংঘের মোট বাজেটের মাত্র চার শতাংশ এই খাতে ব্যয় হয়, যা মোটেও পর্যাপ্ত নয়।
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিষয়ে তিনি অত্যন্ত সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এআই যেমন দ্রুত উন্নয়নের পথ খুলে দিতে পারে, তেমনি এর অপব্যবহার মানবতার জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তার মতে, উদ্ভাবনের গতি থামানো যাবে না, তবে এর জন্য কঠোর নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা জরুরি। প্রযুক্তির উন্নয়ন যেন মানবতার কল্যাণে নিয়োজিত হয় এবং ক্ষতিকর কোনো প্রভাব না ফেলে, সেটি নিশ্চিত করা সব দেশ ও প্রযুক্তিবিদদের সম্মিলিত দায়িত্ব।
নিরাপত্তা পরিষদের সক্ষমতা নিয়ে সমালোচকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাধারণ পরিষদ হলো রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের জন্য একটি নিরাপদ ও শক্তিশালী আলোচনার মঞ্চ। এখানেই বৈশ্বিক সংকটগুলো নিয়ে সরাসরি আলোচনা ও সমাধানের পথ তৈরি করা সম্ভব। তিনি বিশ্বাস করেন, সাধারণ পরিষদই আন্তর্জাতিক নীতি ও মানদণ্ড নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নিজের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চার দশকের বেশি সময় আগে বাংলাদেশের এক সভাপতির অধীনে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে এই উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বে আসার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। বিশেষ করে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখার অভিজ্ঞতা তার কর্মপন্থায় গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে। তিনি স্মরণ করেন, গত বছর রমজানের এক সন্ধ্যায় জাতিসংঘ মহাসচিবের কক্সবাজার সফরের সময় লাখেরও বেশি শরণার্থী ইফতারের জন্য জড়ো হয়েছিল, যা ছিল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
নিজের সভাপতিত্বের শেষ দিনের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমি সেই দিনের অপেক্ষায় আছি যেদিন উত্তরসূরির হাতে সভাপতির হাতুড়ি তুলে দেব। আমার একান্ত ইচ্ছা, ততদিন যেন সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে জাতিসংঘের সংস্কার ও আর্থিক সচ্ছলতার প্রশ্নে একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারি। এছাড়া মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারলে তিনি তার দায়িত্ব পালনকে সার্থক বলে গণ্য করবেন।
পরিশেষে, ড. খলিলুর রহমান বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা যেন জাতিসংঘের ওপর আস্থা ফেরানোর বিষয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও মতামত তুলে ধরেন। সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি শোনার একটি অন্যতম সুযোগ। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধ থাকলে যেকোনো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব, আর সেই ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে জাতিসংঘ নিজেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠাকালীন প্রত্যাশা এবং পরে সদস্য দেশগুলোর প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পেরেছে সংস্থাটি, সেসব ব্যবধানের কথা প্রায়শই ব্যক্ত করেছেন তিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের তুলনায় বাস্তবে কম ক্ষমতা প্রয়োগ এবং অচলাবস্থায় থাকা নিরাপত্তা পরিষদের তুলনায় এর সীমিত কার্যকারিতার মতো সমালোচনারও জবাব দিয়েছেন তিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশ্বনেতারা এখান থেকে কী নিয়ে ফিরে যাবেন বলে আপনি আশা করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এটি আমাদের সমাজগুলোকে যারা পরিচালনা করেন, তাদের কাছ থেকে সরাসরি শোনার একটি সুযোগ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তারা বিশ্বকে কীভাবে দেখেন, নিজেদের অঞ্চল ও দেশকে কীভাবে দেখেন এবং জাতিসংঘের কাছে তাদের প্রত্যাশা কী— তা সরাসরি জানা যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর আপনি কীভাবে বুঝবেন যে আপনি সফল হচ্ছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: খলিলুর রহমান: বিষয়টি বুঝতে হলে ১৯৪৫ সালে এই সংস্থা প্রতিষ্ঠালগ্নের অভিজ্ঞতার দিকে ফিরে যেতে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেই বছর ইয়াল্টায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, রুশ প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্তালিন ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল প্রায় ৮ দিন বৈঠক করেছিলেন।
সূত্র: আলোকিত বাংলাদেশ