
বাংলাদেশের ইলিশের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে, তবে গত কয়েক বছরে ভারত থেকে ইলিশ আমদানির চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রপ্তানির খবর নিয়মিত পাওয়া গেলেও, এখন উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। গত বছরের জুলাই মাস থেকে নিয়মিতভাবে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি শুরু হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১৭ হাজার ৮৫০ কেজি ইলিশ ভারত থেকে এলেও, চলতি বছরের মাত্র সাড়ে নয় মাসে আমদানির পরিমাণ ৪ লাখ ২৭ হাজার কেজিতে পৌঁছেছে।
আমদানিকারকরা বলছেন, ভারত থেকে আসা এই মাছের বড় অংশই আসে গুজরাটের ভারুচ অঞ্চলের নর্মদা নদীর মোহনা থেকে। তবে আরব সাগরের এই ইলিশের স্বাদ বাংলাদেশের পদ্মা বা মেঘনার ইলিশের মতো নয়। অনেক ক্ষেত্রে ডিমওয়ালা মাছ থেকে ডিম আলাদা করে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। আকারে ছোট ও স্বাদে ভিন্ন হওয়ায় এই মাছ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন আগ্রহ নেই।
খুলনার বিশ্বাস ইন্টারন্যাশনালের মতো আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এ বছর বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে বড় চালান এনেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার দীপ্ত বিশ্বাস জানান, তাদের ৬ হাজার ২৩১ কেজি ইলিশ আমদানিতে প্রতি কেজির মূল্য দেখানো হয়েছে ৭৪ থেকে ২৪৭ টাকা পর্যন্ত। তার মতে, মাছের গুণমান অনুযায়ী দাম এমনই এবং ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় ভবিষ্যতে আর আমদানির পরিকল্পনা নেই তাদের। এদিকে ঢাকার রুপা এন্টারপ্রাইজ ৫৭ টাকা ঘোষিত মূল্যে ৭ হাজার ৭২৩ কেজি ইলিশ আমদানি করলেও প্রতি কেজিতে প্রায় ২০০ টাকা শুল্ক পরিশোধ করতে হয়েছে।
বেনাপোলের মেসার্স সততা ফিশ ফিডের মালিক শহিদুর রহমান জানিয়েছেন, তাদের ২৪ হাজার ৭০০ কেজি ইলিশ আমদানিতে খরচ অনেক বেশি। মাছ প্রতি ওজন ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম হওয়ায় খুচরা বাজারে দেড় হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও পাইকারিতে তাদের বড় অংকের খরচ পড়ে। সব মিলিয়ে ইলিশের উৎপাদন সংকট ও আমদানিনির্ভরতা এখন বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, মিয়ানমার থেকে ইলিশ আমদানি চলছে দীর্ঘদিন ধরে। গত দশ বছরের হিসাবে দেখা যায়, গত অর্থবছরেই মিয়ানমার থেকে ১০ লাখ ২৫ হাজার কেজি ইলিশ এসেছে। সব মিলিয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটি থেকে ৩০ লাখ ৬২ হাজার কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। বাংলাদেশের ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ায় রপ্তানির চেয়ে আমদানির পাল্লা এখন ভারী। যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও রপ্তানি বেশি ছিল, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে সোয়া লাখ কেজি, বিপরীতে আমদানি ১০ লাখ ৬২ হাজার কেজি ছাড়িয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত কোনো ইলিশ রপ্তানি হয়নি, কিন্তু এর মধ্যেই ৫ লাখ ৯১ হাজার কেজি আমদানি হয়েছে।
বর্তমানে ইলিশের এই সংকট নিয়ে চট্টগ্রামের মাসুদ ফিশ প্রসেসিং অ্যান্ড আইস কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফ হোসেন মাসুদ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আগে আমরা প্রচুর ইলিশ রপ্তানি করেছি, কিন্তু এখন নিজস্ব চাহিদা পূরণ হবে কি না তা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছে। ভারতের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন পূজার আগে পুনরায় রপ্তানি চালুর আবেদন জানালেও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ঘাটতির কারণে রপ্তানি নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের সংশয়। সরকারের পক্ষ থেকে ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর চলতি বছর সাড়ে ৯ মাসে এসেছে ৪ লাখ ২৭ হাজার কেজি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাইকারিতে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০১৯ সাল থেকে প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ ইলিশ ভারতে রপ্তানির অনুমতি দিয়ে আসছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দুর্গাপূজার সময় বাংলাদেশের ইলিশের জন্য মুখিয়ে থাকেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইলিশের উৎপাদন কমছে চার কারণে, ভরা মৌসুমেও দাম চড়া। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশের রপ্তানি নীতি অনুযায়ী, ইলিশ শর্ত সাপেক্ষে রপ্তানিযোগ্য পণ্য।
সূত্র: প্রথম আলো