প্রতিনিধি 18 September 2026 , 6:33:43 প্রিন্ট সংস্করণ

সকালে ঘুম থেকে উঠে বাজারে না গিয়ে বাড়ির বাগান থেকে টাটকা সবজি সংগ্রহ করা, রান্নার চুলায় প্রাকৃতিক জ্বালানি ব্যবহার আর সূর্যের আলোয় ঘর আলোকিত করা—এমন এক জীবনপদ্ধতি গড়ে তুলেছেন ভারতের কেরালার সংগীত ও কাব্যা দম্পতি। বাইরে থেকে তাঁদের এই বাড়িটি সাধারণ কোনো খামারবাড়ির মতো মনে হলেও, এর অন্দরে লুকিয়ে আছে এক দারুণ স্বনির্ভর ব্যবস্থা। নিজেদের সঞ্চয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে গড়ে তোলা এই বাড়িতে তাঁরা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছেন, যেখানে প্রতিটি সম্পদ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।

এই দম্পতির এই জীবনযাত্রা হঠাৎ করে শুরু হয়নি। তাঁরা দীর্ঘ দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন। একসময় করপোরেট চাকরি তাঁদের দীর্ঘ ভ্রমণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে তাঁরা তা ছেড়ে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেন। সেই ভ্রমণের দিনগুলোতে হোটেলে না থেকে নিজেদের মতো করে গাড়িতে রান্না করা, তাঁবুতে থাকা এবং সীমিত খরচে টিকে থাকার যে অভ্যাস তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন, আজ তা এই বাড়ির স্থায়ী রূপ নিয়েছে। সেই সময়ের বেঁচে থাকার শিক্ষাগুলোই এখন তাঁদের বর্তমান জীবনকে করেছে গতিশীল ও সাশ্রয়ী।
বাড়ির বাগানে সব ধরনের সবজি চাষের পাশাপাশি তাঁরা মাছ ও ধান চাষেরও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পশুপালনের ক্ষেত্রে রয়েছে গরু ও মুরগি, যা থেকে প্রতিদিনের পুষ্টির জোগান পাওয়া যায়। বিশেষ করে গরুর গোবর তাঁদের স্বনির্ভরতার অন্যতম চাবিকাঠি। বাড়ির ভেতরেই রয়েছে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, যেখানে রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য ও গরুর গোবর প্রক্রিয়াজাত করে রান্নার গ্যাস তৈরি করা হয়। বায়ুহীন অবস্থায় অণুজীবের সাহায্যে তৈরি এই গ্যাস তাঁদের বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকখানি কমিয়ে দিয়েছে।
শুধু গ্যাস নয়, বায়োগ্যাস তৈরির পর অবশিষ্ট অংশটি তাঁরা উন্নত জৈব সার হিসেবে কৃষিকাজে ব্যবহার করেন। এর ফলে গোবর থেকে জ্বালানি এবং সেই জ্বালানির বর্জ্য থেকে আবার খাবার উৎপাদনের একটি প্রাকৃতিক চক্র গড়ে উঠেছে। বিদ্যুতের চাহিদার কথা মাথায় রেখে বাড়ির ছাদে স্থাপন করেছেন সোলার প্যানেল। এই সৌরবিদ্যুৎ তাঁরা দৈনন্দিন ব্যবহারের পাশাপাশি কৃষিকাজের সেচব্যবস্থাতেও কাজে লাগাচ্ছেন। তাঁদের লক্ষ্য হলো বাইরের উৎস থেকে বিদ্যুৎ বা জ্বালানি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা।
উৎপাদনের ক্ষেত্রে তাঁরা মাশরুম চাষকেও গুরুত্ব দিয়েছেন, যেখানে কোনো বড় জায়গার প্রয়োজন হয় না। নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বজায় রেখে তাঁরা ২৫ দিন অন্তর নিয়মিত মাশরুম সংগ্রহ করেন। এছাড়া মৌমাছি পালনের মাধ্যমে মধু সংগ্রহের পাশাপাশি বাগানের ফুল ও ফসলের পরাগায়নেও তারা দারুণ ভূমিকা রাখছে। এই মৌমাছি, ফসল ও বাগানের ফুল নিয়ে গড়ে উঠেছে এক চমৎকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য, যা বাড়ির পরিবেশকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।
দৈনন্দিন প্রসাধন সামগ্রীর ক্ষেত্রেও সংগীত ও কাব্যা সম্পূর্ণ ঘরোয়া উপকরণের ওপর নির্ভরশীল। নারকেল, কমলা ও আমলকীর মতো প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে তাঁরা কাজল, ময়েশ্চারাইজার ও ফেসওয়াশের মতো ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যগুলো তৈরি করেন। এতে একদিকে যেমন রাসায়নিকমুক্ত পণ্য ব্যবহার নিশ্চিত হয়, অন্যদিকে বাড়ির গাছগুলো কেবল অক্সিজেনের উৎস হিসেবে নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী হয়ে ওঠে।
পরিবেশের প্রতি এই দম্পতির মমতা কেবল বাড়ির চার দেয়ালেই সীমাবদ্ধ নয়। ভ্রমণের দীর্ঘ পথজুড়ে গত দেড় বছরে তাঁরা ১০ হাজারের বেশি গাছের চারা রোপণ করেছেন। জিপিএস ট্র্যাকিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তায় লাগানো চারাগুলোর সঠিক পরিচর্যা ও পানি দেওয়ার ব্যবস্থাও তাঁরা করে রেখেছেন। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ১ লাখ গাছ লাগানোর এক বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন।
সংগীত ও কাব্যার এই জীবনপদ্ধতি আমাদের শেখায় কীভাবে কম সম্পদ ব্যবহার করে এবং প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি গড়ে জীবন সাজানো সম্ভব। একটির বর্জ্য অন্যটির সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করার এই অনন্য মডেল কেবল খরচই কমায় না, বরং জীবনকে করে তোলে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই। ইনস্টাগ্রাম, টাইমস লাইফ ও দ্য বেটার ইন্ডিয়া থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজের হাতে গড়া এই ছোট পৃথিবীই এখন তাঁদের অদম্য জীবনশক্তির উৎস। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু বাড়িটির আসল বিশেষত্ব একটু ভেতরে ঢুকলে চোখে পড়বে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভ্রমণে তাঁদের জীবনযাপনের ধরন ছিল প্রচলিত পর্যটকদের চেয়ে আলাদা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গাড়িতেই রান্না করতেন, সঙ্গে রাখতেন প্রয়োজনীয় খাবার, তাঁবু ও অল্প কিছু কাপড়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হোটেল বা রেস্তোরাঁর ওপর নির্ভর না করে নিজেদের মতো করে চলতেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অনেক সময় কোনো জলাশয় বা পুকুরে কাপড় ধুয়ে শুকিয়ে আবার যাত্রা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাস্তায় গাড়ির ছোট পরিসরে যেসব কাজ করতেন, সেগুলোই এখন নিজেদের জমি ও বাড়িকে ঘিরে করছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গরু থেকে মিলছে দুধ, মুরগি থেকে ডিম।
সূত্র: প্রথম আলো












