সারাদেশ

মেট্রোরেলে অতিরিক্ত ব্যয় ও পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ

  প্রতিনিধি 18 September 2026 , 8:35:03 প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থা আধুনিকায়নে একের পর এক মেট্রোরেল প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও বাস, রেল, সাইকেল ও হাঁটার পথ—এই মাধ্যমগুলোর সাথে কোনো কার্যকর সমন্বয় গড়ে উঠছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপুল অর্থ ব্যয়ে শুধুমাত্র মেট্রোরেলের ওপর ভিত্তি করে ঢাকাকে একটি কার্যকর নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। পরিবহন খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

শুক্রবার সকালে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যাটিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) আয়োজিত ‘মেট্রোরেলের ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিকল্পনায় ন্যায্যতা: আইপিডির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক ভার্চ্যুয়াল আলোচনা সভায় নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আলোচনায় ২০০৫ সালের স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) বাস্তবায়নের ধীরগতি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করা হয়।

আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, দুই দশক আগে করা এসটিপি অনুযায়ী বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিং, বিআরটি এবং পথচারীবান্ধব ব্যবস্থার যে রূপরেখা ছিল, তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমানে মেট্রোরেল কেন্দ্রিক যে প্রকল্পগুলো নেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। যেসব প্রকল্পের বাজেট ৪০ থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে থাকার কথা ছিল, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ১ লাখ কোটি টাকায় ঠেকেছে। অতিরিক্ত ব্যয়ের এই প্রবণতা প্রকল্পগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম বলেন, বড় প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও নগরবাসীর যাতায়াতের ভোগান্তি কমেনি। তার মতে, মেট্রোর বিকল্প হিসেবে বাসব্যবস্থার মানোন্নয়ন ও বিদ্যমান রেল খাতের উন্নয়ন অনেক কম খরচে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সেবা দিতে পারে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ অন্যান্য ব্যয়বহুল প্রকল্পে যে বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা দিয়ে দেশের অন্যান্য শহরেও উন্নয়নমূলক কাজ করা যেত, যা ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারত।

পরিবহন পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ মুনতাসির মামুন জানান, ঢাকার পরিবহন খাতে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের একটি বড় অংশই মেট্রোকেন্দ্রিক। অথচ বাস্তবতা হলো, ১০টি মেট্রোরেল লাইন চালু হলেও তা নগরীর মোট যাতায়াতের খুব সীমিত একটি অংশ মাত্র বহন করতে পারবে। তাই ইন্টারসেকশন ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক সিগন্যাল ও বাস নেটওয়ার্কের ন্যায় অগ্রাধিকারগুলো নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আইপিডির গবেষক ফরহাদুর রেজা মন্তব্য করেন, আরামদায়ক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কোনো একটি মাধ্যমের ওপর একক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় নতুন করে ঢাকার হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা, বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং গাবতলী থেকে দাসেরকান্দি রুটে মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ও নতুন অনুমোদন দেওয়া হয়। এই তিনটি প্রকল্পের সম্মিলিত ব্যয় প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা।

আইপিডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রাক্কলিত ব্যয়ের প্রায় দ্বিগুণ দরপত্র আসার পরও কেন প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদন দেওয়া হলো, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সংস্থাটি প্রকল্পের পুরো জীবনচক্রের ব্যয়ের তথ্য উন্মুক্ত করা এবং একটি ওপেন ডেটা ড্যাশবোর্ড চালুর পরামর্শ দিয়েছে।

প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বারবার বৃদ্ধির পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্টদের প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিও জানায় আইপিডি। একই সাথে, স্বচ্ছতা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিকভাবে উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং দেশীয় প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতে মেট্রোরেল প্রয়োজনীয় গণপরিবহনের অংশ হওয়ার বদলে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রকল্পে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঢাকাকেন্দ্রিক বড় বড় প্রকল্পের পরিবর্তে দেশের বিভিন্ন শহরে পরিকল্পিতভাবে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা হলে ঢাকার ওপর মানুষের চাপও কমানো সম্ভব। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাস, মেট্রো, রেল, হাঁটা, সাইকেলসহ বিভিন্ন মাধ্যমকে সমন্বিত করেই পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাশাপাশি দেশীয় ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর কথাও বলেছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রকল্পের ব্যয় যাচাইয়ে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যাচাই করার সুপারিশ করেছে আইপিডি।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content