শিক্ষা

মুসলিম নারীদের ইতিহাস ও অবদান সংরক্ষণে কাতারের নতুন বৈশ্বিক উদ্যোগ ‘আলফু মুসলিমাহ

  প্রতিনিধি 24 August 2026 , 7:28:08 প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বজুড়ে মুসলিম নারীদের ঐতিহাসিক অবদান, নেতৃত্ব এবং তাদের জীবনধারাকে যথাযথভাবে নথিবদ্ধ করার লক্ষ্যে কাতারের ‘আল-মুজাদিলাহ সেন্টার অ্যান্ড মসজিদ ফর উইমেন’ একটি বিশেষ বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ‘আলফু মুসলিমাহ’ নামের এই প্রকল্পের মাধ্যমে মুসলিম নারীদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক উত্তরাধিকারকে নতুন করে তুলে ধরার প্রয়াস চালানো হচ্ছে। এডুকেশন সিটিতে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী বিশেষায়িত আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো ইতিহাসে মুসলিম নারীদের অবস্থান সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা। সাধারণত ইতিহাসে নেতৃত্বদানকারী মুসলিম নারীদের কেবল ব্যতিক্রমী বা বিচ্ছিন্ন কিছু চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আল-মুজাদিলাহর রিসার্চ ম্যানেজার ড. নাজাহ নাদি জানান, আধুনিক তরুণীদের সামনে মুসলিম নারীদের আদর্শ হিসেবে উপস্থাপনের উপায় খুঁজতে গিয়েই এই উদ্যোগের ধারণাটি জন্ম নেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ইসলামী নেতৃত্বের মডেল ধারণকারী মুসলিম নারীদের পরিসর এতটাই বিস্তৃত যে, তাদের কেবল ‘ব্যতিক্রমী’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এই উদ্যোগের আওতায় ‘রিআয়া’ বা দায়িত্বশীল তত্ত্বাবধানের ইসলামী ধারণার আলোকে নারীদের নেতৃত্ব সম্পর্কে আরও গভীর ও বিস্তৃত ধারণা তুলে ধরা হবে। ড. নাজাহর মতে, জ্ঞান উৎপাদন, গবেষণা, রাজনীতি, সমাজসেবা, অর্থনীতি এবং পারিবারিক কাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে মুসলিম নারীদের অংশগ্রহণ নতুন কোনো বিষয় নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহ্য। মুসলিম সম্প্রদায়ের অর্ধেকই নারী, তাই তাদের অবদানকে নথিবদ্ধ করা ইসলামের সামগ্রিক ইতিহাস অনুধাবনের জন্য অপরিহার্য।

গবেষণা কার্যক্রমটি অত্যন্ত ব্যাপক পরিসরে পরিচালিত হবে। এতে ইসলামী সভ্যতাভুক্ত বিশ্বের ১১টি বিস্তৃত অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আরবি ও ফার্সি-প্রভাবিত অঞ্চল, তুর্কি অঞ্চল, ভারতীয় উপমহাদেশ, সাব-সাহারান আফ্রিকা, মালয় দ্বীপপুঞ্জ, চীন ও পূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া, ইংরেজিভাষী দেশসমূহ, মূল ভূখণ্ডের ইউরোপ এবং লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল।

প্রকল্পের অংশ হিসেবে ৫০০টিরও বেশি জীবনী অভিধান, পাণ্ডুলিপি, আর্কাইভ এবং সমকালীন ও ধ্রুপদি উৎস ব্যবহার করা হবে। গবেষকরা শুধু নারীদের জীবনীর তথ্যই সংগ্রহ করবেন না, বরং ঐতিহাসিক উৎসগুলোতে তাদের কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সেই বর্ণনার বিবর্তন কীভাবে ঘটেছে, তাও বিশ্লেষণ করবেন। এভাবে সংগৃহীত তথ্য নিয়ে একটি যৌথ বিশ্বকোষ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

ড. নাজাহ নাদি জানান, কাতারসহ বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের গবেষক, শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগে অংশ নিতে পারবেন। আবেদনকারীরা প্রকল্পের সুপারিশকৃত তালিকা থেকে ব্যক্তিত্ব বেছে নিতে পারেন অথবা নিজস্ব গবেষণার ক্ষেত্র থেকে নতুন নাম প্রস্তাব করতে পারেন। প্রতিটি আবেদনকারী সর্বোচ্চ তিনটি প্রস্তাবনা জমা দিতে পারবেন।

প্রস্তাবনাগুলো আরবি বা ইংরেজি ভাষায় জমা দেওয়া যাবে। জমা দেওয়া প্রস্তাবগুলোর গবেষণাগত মান ও প্রকল্পের পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যতা যাচাই করা হবে। অংশগ্রহণকারীদের প্রচলিত জীবনী লেখার গণ্ডি পেরিয়ে নারীদের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র ও নেতৃত্বের ধরনকে বৈচিত্র্যময়ভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে।

একাডেমিক গবেষণার পাশাপাশি গল্প বলা, মৌখিক ইতিহাস এবং ভিজ্যুয়াল উপকরণের মাধ্যমে এই তথ্যগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে তোলাও প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য। এর ফলে নতুন প্রজন্ম মুসলিম নারীদের দীর্ঘ ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে এবং নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে আরও সচেতন হয়ে উঠবে।

এই উন্মুক্ত প্রস্তাবনা আহ্বানের সময়সীমা ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। বিস্তারিত তথ্য আল-মুজাদিলাহ সেন্টারের ওয়েবসাইট বা সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম থেকে পাওয়া যাবে।

পরিশেষে, ড. নাজাহ নাদি এই প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য সম্পর্কে বলেন, এর মাধ্যমে মুসলিম নারীদের অবদানের একটি সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় নথি তৈরি হবে। এটি শুধু জীবনী সংকলন নয়, বরং ভবিষ্যতে মুসলিম নারীদের ইতিহাস নিয়ে গবেষণার একটি স্থায়ী সম্পদ হিসেবে কাজ করবে, যা শিক্ষা ও জনপরিসরে তাদের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সম্প্রতি দ্যা পেনিনসুলায় এবিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নাজাহ আরো বলেন, “নারীদের সম্পর্কে নথি আছে কি না, আমরা শুধু সেটিই জানতে আগ্রহী নই; বরং নারীদের কীভাবে নথিবদ্ধ করা হয়েছে, সেটিও আমাদের আগ্রহের বিষয়।” তিনি জানান, মুসলিম নারীদের ইতিহাস কীভাবে সংরক্ষিত ও এর ব্যাখ্যা কিভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গবেষক ও শিক্ষাবিদদের জন্য এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, বিদ্যমান ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলোর ঘাটতি চিহ্নিত করা এবং বহু সংখ্যক গবেষণাকে উৎসাহিত করা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উন্মুক্ত প্রস্তাবনার আহ্বানটি ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বহাল থাকবে।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content