সারাদেশ

এক বছর পূর্ণ ডাকসুর: প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সমালোচনার মুখে নেতারা

  প্রতিনিধি 9 September 2026 , 2:27:47 প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের এক বছর পূর্ণ হলো আজ ৯ সেপ্টেম্বর। ২০২৫ সালের এই দিনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অধিকাংশ পদে জয়ী হয়েছিল ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’। নির্বাচনের এক বছর পর ক্যাম্পাসের সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং ডাকসুর কার্যক্রম নিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। যদিও গত এক বছরে ক্যাম্পাসে বড় ধরনের মারামারি বা হল দখলের মতো ঘটনা ঘটেনি এবং ক্লাস-পরীক্ষা নির্বিঘ্নে চলেছে, তবে শিক্ষার্থীদের মৌলিক সমস্যার সমাধান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

ভর্তি হওয়ার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও অমর একুশে হলের শিক্ষার্থী শাফিনূর রহমান তাজিম এখনো হলে বৈধ আসন পাননি। তিনি জানান, আসন না পাওয়ায় বাইরে ভাড়া থাকতে হচ্ছে, যা তাঁর জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ ও ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডাকসুর ইশতেহারে প্রথম বর্ষ থেকে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য বৈধ আসন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

ডাকসু নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তালিকায় রয়েছে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, মব তৈরি করা এবং প্রতিপক্ষকে বিভিন্ন নেতিবাচক ট্যাগ দেওয়া। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান মনে করেন, ভোটের রাজনীতির কারণে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও তা কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ভয়ের পরিবেশের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান হয়েছিল, ডাকসু নির্বাচনের পর তার পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে মনে হচ্ছে।

ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে শিবির নিজেদের নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় হিসেবে উপস্থাপন করলেও ভোটের পর তারা জামায়াতে ইসলামীর লেজুড়বৃত্তি করছে। তিনি আরও দাবি করেন, ছাত্রদল যাতে হলে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে না পারে, সেজন্য শিবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামে আন্দোলন করানোর কৌশল নিয়েছিল।

ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদ দাবি করেছেন, ৩৬টি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তারা উদ্যোগ নিয়েছেন। সাদিক কায়েমের ভাষ্যমতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এই অভিযোগ নাকচ করে জানিয়েছেন, ডাকসুর জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের চেয়েও বেশি অর্থ প্রদান করা হয়েছে।

খাবারের মান উন্নয়ন ছিল ইশতেহারের অন্যতম অগ্রাধিকার। কিন্তু তাসফিয়ান আহমেদ নামের এক শিক্ষার্থী জানান, দাবি জানানো বা বৈঠকের পর সাময়িক প্রচার চললেও খাবারের মানের স্থায়ী কোনো পরিবর্তন আসেনি। সম্প্রতি কয়েকটি হলের ক্যানটিনে খাবারে কেঁচো পাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেস্টফিডিং রুম বা চাইল্ড কেয়ার কর্নারের মতো প্রতিশ্রুতিগুলোর অগ্রগতি নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।

ডাকসু নেতাদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযানের নামে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, মাঠে খেলতে যাওয়া শিশুদের কান ধরিয়ে ওঠবস করানো, আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষককে হেনস্তা এবং কনসার্টে সিগারেট বিতরণের মতো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া জাতীয় নির্বাচনের সময় ডাকসু নেতাদের জামায়াতের প্রচারণায় অংশ নেওয়া নিয়েও সমালোচনার ঝড় উঠেছিল।

২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের আগে দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে। এরপর ছাত্রলীগকে হল থেকে বিতাড়িত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাসে শিবিরের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা পায়। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন কোনো ধরনের লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি ফিরে না আসে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম জানিয়েছেন, ডাকসু নির্বাচন নিয়মিত হওয়া উচিত এবং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া হওয়া প্রয়োজন। ২০১৯ সালের পর ২০২৫ সালে দীর্ঘ বিরতির পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ডাকসুর মেয়াদ আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মতে, ইতিবাচক পরিবর্তন ধরে রাখতে ডাকসু নির্বাচন নিয়মিত আয়োজন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছেন অমর একুশে হলের শিক্ষার্থী শাফিনূর রহমান তাজিম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২৫ সালের এদিন ডাকসুর ভোট গ্রহণ হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এক বছর পরে এসে দেখা যাচ্ছে, আবাসনসংকট, খাদ্যের মান, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ডাকসুর প্রতিশ্রুতির সামান্যই পূরণ হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অন্যদিকে শিবিরের প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনগুলো বলছে, ডাকসুর নেতারা বিতর্কে জড়িয়েছেন বেশি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দলটির নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কেউ কেউ বলছেন, অতীতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোয় শিবিরের নেতা-কর্মীরা শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিস্বাধীনতায় নানাভাবে হস্তক্ষেপ করতেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাদের আগের মতো হল দখলের চেষ্টা করতে দেখা যায়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে তা কত দিন টেকসই হয়, সেটা দেখার বিষয়।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content