শিক্ষা

শিক্ষায় বৈষম্য দূর করে মেগা প্রকল্পের লক্ষ্য হোক মানসম্মত শিক্ষা

  প্রতিনিধি 22 August 2026 , 11:35:50 প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি প্রতিটি সংসদীয় আসনে দুটি করে মোট ৬০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্যাডেট কলেজের আদলে গড়ে তোলার একটি সরকারি সিদ্ধান্তের কথা জানা গিয়েছিল। শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন জানিয়েছিলেন, মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করাই ছিল এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৮ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। তবে বাস্তবে এই ব্যয় ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল। এছাড়া ক্যাডেট কলেজের আদলে প্রতিটি শিক্ষার্থীর পেছনে বার্ষিক প্রায় ৬ লাখ টাকা আবর্তক ব্যয় বহন করাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতো। সম্ভবত এসব বাস্তবতার নিরিখেই সরকার এই প্রকল্প থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ক্যাডেট কলেজের সুবিধাভোগী হিসেবে আমি মনে করি, দেশের সব শিশুর জন্য এমন সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে তা হতো দারুণ। কিন্তু তার আগে আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বর্তমান ভঙ্গুর অবস্থার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। ব্যানবেইসের তথ্যমতে, দেশে মোট ২১ হাজার ৮৬টি জুনিয়র ও হাইস্কুল রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি স্কুলের সংখ্যা মাত্র ৬৯১টি, যেখানে ৫ লাখ ৭১ হাজার ৬৮১ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। অন্যদিকে, ১৯ হাজার ৭৫৭টি বেসরকারি স্কুলের প্রায় ৮৭ লাখ শিক্ষার্থী সরকারি সহায়তার অভাবে ধুঁকছে। বিশেষ করে ১ হাজার ৭১৭টি হাইস্কুল ও ১ হাজার ৬২৯টি জুনিয়র হাইস্কুল এখনো এমপিওভুক্ত নয়, যেখানে শিক্ষকরা অত্যন্ত মানবেতর বেতনে পাঠদান করেন।

সরকারি ও এমপিওভুক্ত স্কুলের মধ্যে মাথাপিছু ব্যয়ের আকাশ-পাতাল পার্থক্য বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, একটি এমপিওভুক্ত স্কুলে মাথাপিছু বার্ষিক ব্যয় যেখানে ৯ হাজার ৭০০ টাকা, সেখানে সরকারি স্কুলে তা ২৮ হাজার ৮০০ থেকে ৩৩ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত হয়। এছাড়া ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় দেড় কোটি শিশুর শিক্ষার মান নিয়ে খোদ সরকারি পরিদর্শনেই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ১২ শতাংশ বিদ্যালয় বাদে বাকি ৮৮ শতাংশের অবস্থা নাজুক। অনেক ক্ষেত্রে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা বাংলা ও ইংরেজি পড়তে হিমশিম খায়। এই শিখনঘাটতি কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।

শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যমান এই ‘বর্ণবৈষম্য’ একদিনে দূর করা সম্ভব নয়, তবে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ষষ্ঠ শ্রেণিকে প্রাথমিকে অন্তর্ভুক্ত করার আগে অঙ্ক ও ইংরেজিতে দক্ষ অন্তত দুজন করে প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া উচিত। পাশাপাশি মাধ্যমিক পর্যায়ের ৮৭ লাখ সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীর মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সব স্কুলকে পর্যায়ক্রমে সরকারীকরণ এবং এমপিওভুক্তির আওতায় আনা জরুরি। শিক্ষকদের বিকল্প জীবিকার চিন্তা থেকে মুক্তি দিয়ে পাঠদানে মনোযোগী করতে পরিদর্শনব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ এবং গত অর্থবছরের ৮৭ হাজার কোটি টাকার তুলনায় দেড় গুণেরও বেশি। আগামী পাঁচ বছরে এই ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার সরকারি প্রত্যয় প্রশংসনীয়। তবে মেগা প্রকল্পের সংজ্ঞা পরিবর্তন করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রয়োজনে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্প পিছিয়ে দিয়েও শিক্ষা খাতে বছরে অতিরিক্ত ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক শিক্ষা হাব হওয়ার যে স্বপ্ন শিক্ষামন্ত্রী দেখিয়েছেন, তা বাস্তবায়নের পথ দীর্ঘ। বর্তমানে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। যেমন, জার্মানিতে পড়তে আগ্রহী ৮০ হাজার শিক্ষার্থীর ভিসার আবেদন দূতাবাসে আটকে আছে। ঢাকা মিশনের বর্তমান সক্ষমতা অনুযায়ী এই ব্যাকলগ পরিষ্কার করতে ৪০ বছর সময় লেগে যাবে। আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ওপর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা না গেলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করা অসম্ভব। তাই ৩০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এখনই কাজ শুরু করা প্রয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাস্তবায়ন পর্যায়ে অবশ্য এই হিসাব টিকত না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রকৃত ব্যয় ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়াত—এমনটা ধরেই নেওয়া যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সবকিছু বিবেচনা করেই হয়তো প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে আর অগ্রসর না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ক্যাডেট কলেজে পড়তে পারা একটি বিরাট প্রিভিলেজ, আর আমি তার একজন বেনিফিশিয়ারি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেশের সব শিশু-কিশোরকে যদি এ রকম বা এর কাছাকাছি সুযোগ দেওয়া যেত, তবে এর চেয়ে কাম্য আর কিছু হতে পারত না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রাথমিক শিক্ষায় ভালো মানের শিক্ষক কেন আসবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট জুনিয়র স্কুল ও হাইস্কুলের সংখ্যা ২১ হাজার ৮৬।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content