স্বাস্থ্য

সেপসিস চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমাতে নতুন গবেষণার সাফল্য

  প্রতিনিধি 9 September 2026 , 6:32:33 প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেটের অনলাইন জার্নাল ‘ই-ক্লিনিক্যাল মেডিসিন’-এ গত ৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশি চিকিৎসক ও গবেষক ডা. ফরহাদ উদ্দিন হাসান চৌধুরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। ‘প্রোক্যালবান’ নামের এই গবেষণায় সেপসিস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার উপায় নিয়ে কাজ করা হয়েছে। এই গবেষণার প্রেক্ষাপট ও এর সুফল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ডা. ফরহাদ উদ্দিন হাসান চৌধুরী।

সেপসিস হলো শরীরের এমন একটি জটিল অবস্থা, যেখানে সংক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বাংলাদেশে সেপসিস আক্রান্ত রোগীদের দীর্ঘ সময় ধরে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে, যা রোগীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বাড়ানোর পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক-রেজিস্ট্যান্স বা জীবাণুর ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি করে। এই সংকট মোকাবিলায় রক্তে প্রোক্যালসিটোনিন নামক মার্কারের মাত্রা পরীক্ষার মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের সময়সীমা কমিয়ে আনার কৌশল নিয়ে কাজ করেছেন গবেষক।

ডা. ফরহাদ উদ্দিন হাসান চৌধুরীর সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে কাজের আগ্রহ তৈরি হয় ইন্টারনাল মেডিসিনে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জনের পর। পরবর্তীতে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে লিভারপুল স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন থেকে ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন তিনি। দেশে ফিরে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব এবং কোভিড অতিমারির সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ভয়াবহতা ও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের চ্যালেঞ্জগুলো কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেন।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লিনিক্যাল মেডিসিনে পিএইচডি গবেষণার অংশ হিসেবে তিনি এই প্রকল্পটি হাতে নেন। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের জোগান দিয়েছে যুক্তরাজ্যের ওয়েলকাম ট্রাস্ট। ডা. ফরহাদ প্রধান গবেষক হিসেবে ৫৭ জনের একটি বিশাল দল নিয়ে কাজ করেছেন এবং অধ্যাপক আরিয়ান ডনডর্প তার প্রধান সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গবেষণার নৈতিক অনুমোদন নেওয়া হয়েছে দেশি-বিদেশি তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০২৩-২৪ সালে ভর্তি হওয়া রোগীদের ওপর এই ক্লিনিক্যাল গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণার জন্য এক হাজার দুইজনের তথ্য যাচাই করা হলেও শেষ পর্যন্ত ৫৩২ জন রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে ১৬ বছরের কম বয়সী, ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বের রোগী এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের এই গবেষণার বাইরে রাখা হয়েছিল। দৈবচয়নের ভিত্তিতে রোগীদের দুটি দলে ভাগ করে এক দলের ওপর প্রচলিত চিকিৎসা এবং অন্য দলের ওপর প্রোক্যালসিটোনিন-নির্দেশিত চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়।

ফলাফলে দেখা যায়, প্রচলিত পদ্ধতিতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মধ্যম সময় ছিল ৯ দিন। অন্যদিকে, প্রোক্যালসিটোনিন পরীক্ষার মাধ্যমে যাদের চিকিৎসা করা হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই সময়কাল কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭ দিনে। দুই দলের মধ্যে মৃত্যুহার বা পুনরায় সংক্রমণের হারে কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রোক্যালসিটোনিন-নির্দেশিত দলে অ্যান্টিবায়োটিকের মধ্যম খরচ ছিল ৩৭ দশমিক ১ ডলার, যেখানে প্রচলিত চিকিৎসার ক্ষেত্রে তা ছিল ৪৫ দশমিক ৮ ডলার। তবে প্রোক্যালসিটোনিন পরীক্ষার খরচ যোগ করলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৫৩ দশমিক ১ ডলার, যা প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে কিছুটা বেশি। ডা. ফরহাদ জানান, এটি পূর্ণাঙ্গ ব্যয়সাশ্রয়ী বিশ্লেষণ নয়, কারণ এতে রোগীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হ্রাস বা দীর্ঘমেয়াদী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

বাংলাদেশি গবেষক মনে করেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উদ্যোগ নিলে প্রোক্যালসিটোনিন পরীক্ষার খরচ কমিয়ে আনা সম্ভব। সরকারি পর্যায়ে এই পরীক্ষার সুযোগ তৈরি হলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার রোধ করা যাবে। এই গবেষণা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ কেবল আন্তর্জাতিক গবেষণার ক্ষেত্র নয়, বরং নিজস্ব স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধানে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ উপস্থাপনেও সক্ষম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বসাম্প্রতিক তথ্য সহজে সবার কাছে পৌঁছে দিতে তাদের আছে একটি উন্মুক্ত অনলাইন জার্নাল ই-ক্লিনিক্যাল মেডিসিন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংক্ষেপে গবেষণাটির নাম ‘প্রোক্যালবান’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কী নিয়ে এই গবেষণা, দেশের মানুষেরই–বা কী কাজে আসবে, জানতে এই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেছেন রাফিয়া আলম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সহজভাবে বলতে গেলে, সেপসিস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের সময়কাল কমিয়ে আনতে একটি ‘সাধারণ রক্ত পরীক্ষা’ কতটা সহায়ক, তা নিয়েই এ গবেষণা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে যার মাত্রা বাড়ে; সংক্রমণ কমে আসছে কি না, তা-ও বোঝা যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তখন অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গুরুতর সংক্রমণ হলে দেহে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content