আইন-আদালত

আপিল বিভাগে আইনজীবীদের আয় নিয়ে মন্তব্যের জেরে এজলাস ছাড়লেন প্রধান বিচারপতি

  প্রতিনিধি 9 September 2026 , 1:18:07 প্রিন্ট সংস্করণ

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জেরে বিচারিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকনের একটি মন্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী এজলাস ছেড়ে চলে যান। ঘটনার সূত্রপাত হয় দুপুরে, যখন ব্যারিস্টার খোকন সকালে একটি মামলায় আরোপিত জরিমানা মওকুফের জন্য মৌখিক আবেদন জানান। প্রধান বিচারপতি সেই আবেদন নাকচ করে দিলে এক পর্যায়ে ব্যারিস্টার খোকন মন্তব্য করেন যে, প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনজীবীদের আয় কমে গেছে। এই বক্তব্যকে আদালত অবমাননার শামিল বলে অভিহিত করেন প্রধান বিচারপতি। তিনি জানান, এমন মন্তব্যের পর তিনি আর আদালতের কার্যক্রমে অংশ নেবেন না। এরপরই তিনি অন্য চার বিচারপতিকে নিয়ে এজলাস ত্যাগ করেন।

এর আগে সকাল সাড়ে ৯টায় প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চে কার্যক্রম শুরু হয়। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা ছিলেন বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক, বিচারপতি ফারাহ মাহবুব এবং বিচারপতি মো. হাবিবুল গণি। দিনের শুরুতে যাত্রাবাড়ী থানার ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদের নিয়োগ সংক্রান্ত একটি রিট আপিলের শুনানি হয়। শুনানিতে সরকার পক্ষের কৌঁসুলিরা জানান, আপিলকারী মোহাম্মদ নুর আলম তথ্য গোপন করে একই বিষয়ে হাইকোর্টে একাধিক রিট আবেদন করেছেন। আদালত এই প্রতারণার দায়ে রিটকারী মোহাম্মদ নুর আলম ও তার আইনজীবী সুফিয়া আহামেদকে পৃথকভাবে ৫ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেন। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই অর্থ ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক জানান, ২০১৩ সাল থেকে শুরু হওয়া এই আইনি লড়াইয়ে একই বাদী ও আইনজীবী বারবার তথ্য গোপন করেছেন। টানা তিন দিন শুনানির পর আদালত এই আদেশ দেন। তিনি আরও জানান, আদেশ দেওয়ার সময় নারী আইনজীবী সুফিয়া আহামেদ আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি তা মেনে নিয়েছিলেন। তবে দুপুরে যখন ব্যারিস্টার খোকন জরিমানা মওকুফের আবেদন করেন, তখন ওই নারী আইনজীবী সেখানে ছিলেন না। অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান বিচারপতি বিচারিক শৃঙ্খলা ও সততাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। ব্যারিস্টার খোকনের মন্তব্যটি অপ্রত্যাশিত ছিল, কারণ তিনি একজন সংসদ সদস্য। অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্যমতে, প্রধান বিচারপতি বিষয়টিকে প্রথমে হালকাভাবে নিলেও খোকন তার অবস্থানে অনড় থাকায় তিনি কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখান।

ঘটনার বিষয়ে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন সাংবাদিকদের জানান, তিনি একজন জুনিয়র আইনজীবীর ওপর ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিষয়টি ন্যায়বিচারের স্বার্থে পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন। তিনি বলেন, আপিল বিভাগে বেঞ্চের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং মামলা শুনানি না হওয়ায় আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার প্রসঙ্গটি তিনি তুলেছিলেন। তার দাবি, তিনি প্রধান বিচারপতিকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে মামলা জট বাড়ছে এবং শুনানি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। নিজের একটি মামলার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এক বছর ধরে আপিল বিভাগে একটি মামলা স্থগিত রয়েছে এবং চারবার চেম্বার জজের কাছে শুনানির জন্য নির্ধারণ করেও তা সম্ভব হয়নি। খোকন দাবি করেন, তিনি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কোনো তর্কে জড়াননি এবং প্রধান বিচারপতি এত দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাবেন তা তিনি ভাবেননি।

উল্লেখ্য যে, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আপিল বিভাগের এজলাসে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত রাখা হয়েছে। ফলে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ আইনজীবীদের বর্ণনা থেকেই জানা গেছে। আদালত অঙ্গনে এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে এবং অনেক সিনিয়র আইনজীবী জানিয়েছেন, আপিল বিভাগে এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখা যায়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বার সভাপতির এই বক্তব্যের পর প্রধান বিচারপতি খোকনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি যা বলেছেন তা আদালত অবমাননার শামিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আপনি যেহেতু এত বড় কথা বলেছেন, আজকে আমি আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবো না। চাকরির আরও তথ্য: আপিল আবেদনের বিষয়ে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক বলেন, ২০১৩ সালে অস্থায়ী কাজী নিয়োগকে কেন্দ্র করে এ মামলার সূত্রপাত। চাকরির আরও তথ্য: নূর আলম ২০১৬ সালে রিট আবেদন করেন, রিট পিটিশন নম্বর ১৪৮২১। চাকরির আরও তথ্য: সেখানে অস্থায়ী নিয়োগ স্থায়ী করার আবেদন করা হয় এবং স্থায়ী নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির নিয়োগ বাতিল চাওয়া হয়। চাকরির আরও তথ্য: এরপর ২০১৮ সালে ১৬০৮৮ নম্বর রিট আবেদন করা হয়। চাকরির আরও তথ্য: আগের মামলাগুলোর তথ্য গোপন করে ২০২১ সালে ১১৪৪৬ নম্বর এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালে ৯৬৩১ নম্বর রিট আবেদন করা হয়।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content