প্রতিনিধি 21 September 2026 , 5:25:22 প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গত কয়েক মাসে তৈরি হওয়া অস্থিরতা এক নতুন ও উদ্বেগজনক মোড় নিয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার আঁচ এখন ইয়েমেন সীমান্তেও লেগেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের সাথে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সরাসরি সংঘাত দেশটিতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশীর নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিয়ে গভীর শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। লোহিত সাগরের কৌশলগত অবস্থান ও বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হুথিদের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য এই পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সৌদি আরব বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য এক নাম। বর্তমানে দেশটিতে ৪০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশী প্রবাসী কর্মরত আছেন। শ্রমশক্তি রপ্তানির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই রেকর্ড ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন বাংলাদেশী কাজের সন্ধানে সৌদি পাড়ি জমিয়েছেন, যা ওই বছর বাংলাদেশ থেকে মোট প্রবাসগামী কর্মীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৭৭ জন সেখানে গিয়েছেন। শুধু জনবলই নয়, রেমিট্যান্সের দিক থেকেও দেশটি বাংলাদেশের প্রধান ভরসা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এলেও, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের জুলাই মাসেই দেশটি থেকে ৫৮ কোটি ৭৩ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে।
তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সৌদি আরবের উন্নয়ন প্রকল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, অর্থনৈতিক মন্দা বা যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে শিল্প ও সেবা উভয় খাতেই শ্রমের চাহিদা কমতে পারে। কোভিডের সময়ের অভিজ্ঞতা টেনে তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের চাকরি হারানো ও দেশে ফিরে আসার প্রবণতা বেড়ে যায়, যা সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের নাজরান, খামিস মুশাইত, জিজান এবং আবহায় ভয়াবহ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হুথিরা। আরামকোর স্থাপনাগুলোসহ বিভিন্ন বিমানঘাঁটিতে চালানো এসব হামলার পর দেশটিতে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মক্কা ও জেদ্দার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর কাছাকাছি ড্রোন ধ্বংস হওয়ার ঘটনায় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মক্কা নগরীতে হামলার চেষ্টা করাকে সৌদি আরব ‘রেড লাইন’ হিসেবে ঘোষণা করলেও হুথিরা অবশ্য মক্কাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর তায়েফে হুথিদের একটি ড্রোন ধ্বংসের পর এর ধ্বংসাবশেষের আঘাতে এক ইয়েমেনি নাগরিকের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
মক্কায় অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশী সাব্বির রহমান জানান, প্রথমবারের মতো মসজিদুল হারামের কাছাকাছি এলাকায় জরুরি সতর্কতার সাইরেন বাজার পর প্রবাসীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় থাকলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক কাটছে না। ফেনীর নুরুল আফসার নামের এক প্রবাসী ব্যবসায়ী জানান, কোভিডের ধকল কাটতে না কাটতেই নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, যা ছোট ব্যবসায়ীদের কোণঠাসা করে ফেলেছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগের কারণ। বছরে প্রায় ৬৫-৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদার একটি বড় অংশ সৌদি আরামকোর কাছ থেকে সরবরাহ করা হয়। হুথিদের হামলায় পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং ইউরোপের রিফাইনারিতে তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্ট মাসে সৌদি আরবের তেল উৎপাদন গত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে অর্থাৎ দৈনিক ৬২ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সৌদি সরকারের তথ্যভাণ্ডার ‘ডেটাসৌদি’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সৌদি আরবের রপ্তানি ছিল ১৪০ কোটি ডলার। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ৪৫ দশমিক ৮ কোটি ডলারের পণ্য সৌদি আরবে রপ্তানি হয়েছে, যার বেশিরভাগই তৈরি পোশাক। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। যদিও গত জুলাইয়ে সৌদি প্রতিনিধিদের সাথে বাংলাদেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধির আলোচনা হয়েছিল এবং ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান প্রধানমন্ত্রীকে সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন, তবে বর্তমান পরিস্থিতির কারণে বড় বিনিয়োগ প্রকল্পগুলো অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
কেজ বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের আবহা, নাজরান ও জিজানসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর বাংলাদেশী কৃষি, খামার ও ছোট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, যারা সরাসরি যুদ্ধের হুমকির মুখে রয়েছেন। পরিস্থিতি অস্থিতিশীল থাকলে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ—উভয়ই হুমকির সম্মুখীন হবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, সৌদি আরবে পরিস্থিতির অবনতি হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে শুধু নয়, ইউরোপের বাজারগুলোতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি প্রক্রিয়ায়ও বিঘ্ন ঘটতে পারে। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া একটি বড় ঝুঁকি। সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে এবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ইয়েমেন ফ্রন্ট। চাকরির আরও তথ্য: সৌদি আরব থেকে বড় অংকের বিনিয়োগ আনার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। চাকরির আরও তথ্য: যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবের নির্মাণ, সেবা ও অন্যান্য শ্রমঘন খাতে প্রকল্পের গতি কমা, নতুন কর্মী নিয়োগ হ্রাস কিংবা বিদ্যমান কর্মীদের আয় ও কাজের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সে রকম কিছু হলে দেশটি থেকে আসা রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে। চাকরির আরও তথ্য: ফলে অনেকে চাকরি হারিয়ে দেশে ফেরত এলে শ্রমবাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তখন রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি করবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রেমিট্যান্স যেভাবে আসছিল, সেটি ব্যাহত হলে রিজার্ভ বাড়ার গতিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরদিন মক্কা, জেদ্দা ও তায়েফেও বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে নিরাপদ থাকতে বলা হয়।
সূত্র: গালফ বাংলা



















