প্রতিনিধি 13 September 2026 , 12:17:11 প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারি মালিকানাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের (এপিএসসিএল) কার্যক্রমে ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। ২০৮ পৃষ্ঠার এক অডিট রিপোর্টে গত তিন অর্থবছরের হিসাব পরীক্ষায় ৯ হাজার ৬৯৭ কোটি ৫০ লাখ ৭০ হাজার ৪৩৫ টাকার অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে এসেছে। দেশের অন্যতম বড় এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৬টি ইউনিটের মাধ্যমে মোট ১ হাজার ৬৪৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। ২০২২-২০২৩, ২০২৩-২০২৪ এবং ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের হিসাবের ওপর ভিত্তি করে এই কমপ্লায়েন্স অডিট পরিচালনা করা হয়।

গত বছরের ২৪শে আগস্ট থেকে ২৫শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অডিট কার্যক্রম পরিচালনার পর এ বছরের ১৪ই জানুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অডিট অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. নিজাম খান চূড়ান্ত অডিট ইন্সপেকশন রিপোর্টটি ইস্যু করেন। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পাঠানো এই প্রতিবেদনে ৪৫টি অডিট মেমোকে চূড়ান্ত ৪৫টি অনুচ্ছেদে রূপান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ থেকে ৩৫ নম্বর অনুচ্ছেদ পর্যন্ত ৩৫টিকে ‘গুরুতর আর্থিক অনিয়ম’ (এসএফআই) এবং ৩৬ থেকে ৪৫ নম্বর অনুচ্ছেদ পর্যন্ত ১০টিকে ‘সাধারণ অনিয়ম’ (নন-এসএফআই) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ৬৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন অবসরপ্রাপ্ত ইউনিট ১ ও ২ বিক্রির সময় অ্যাসেট ভ্যালুয়েশন বা সম্পদ মূল্যায়নে কারচুপি করে স্যালভেজ ভ্যালু অস্বাভাবিক কম দেখানো হয়েছে, যার ফলে কোম্পানির ৪২ কোটি ৬০ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ৪৫০ মেগাওয়াট সিসিপিপি (ইস্ট) বিদ্যুৎ কেন্দ্রে চুক্তির শর্ত ভেঙে ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড শেষ হওয়ার আগেই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয় এবং ২০২৩ সালের মে মাসে কেন্দ্রটি ফোর্স শাটডাউন করতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী ইপিসি ঠিকাদারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের কথা থাকলেও তা না করে কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে ১০৯ কোটি ৬২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
অনিয়মের তালিকায় আরও রয়েছে, পরিবহন পুলে পর্যাপ্ত গাড়ি থাকা সত্ত্বেও ভাড়া গাড়ি ব্যবহারের মাধ্যমে কোম্পানির ২ কোটি ৫৪ লাখ ৮০ হাজার ৮০ টাকা ক্ষতিসাধন। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসা বরাদ্দ না দেওয়ায় ১ কোটি ৮৪ লাখ ১৫ হাজার ৮০৫ টাকা বাসা ভাড়া বাবদ লোকসান হয়েছে। এছাড়া পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য নির্মিত ঘরের ছাদে প্যাটেন স্টোন ও জানালার থাই গ্লাসের কাজ না করেই ঠিকাদারকে ২ কোটি ২৯ লাখ ১৭ হাজার ২২৮ টাকার বিল পরিশোধের অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে।
অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির শর্ত মানা হয়নি। প্লান্টের বীমা না করায় প্রিমিয়াম ও ভ্যাট বাবদ সরকারের ১৪ কোটি ৭৯ লাখ ১০ হাজার ১২৫ টাকা ক্ষতি হয়েছে। আবার অর্থ বিভাগের ছাড়পত্র ছাড়াই ডিপিপি প্রণয়ন না করে বিভিন্ন প্রকল্পে ২ কোটি ৭৯ লাখ ৯৪ হাজার ৪৫৯ টাকা অনিয়মিত ব্যয় করা হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া সাময়িক আগাম টাকা নির্ধারিত সময়ে সমন্বয় না করায় কোম্পানির ৭ কোটি ৯২ লাখ ৮০ হাজার ৯৮১ টাকা আটকে আছে। পটুয়াখালী প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় কমিটি গঠন ছাড়াই দরপত্র চূড়ান্ত করে চুক্তি স্বাক্ষরের মতো অনিয়মও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে দেখা গেছে, ডিফেক্ট সার্ভিস লায়াবিলিটি পিরিয়ডের মধ্যে যান্ত্রিক ত্রুটি সত্ত্বেও পারফরম্যান্স গ্যারান্টি বাজেয়াপ্ত না করায় কোম্পানির ১৪৮ কোটি ৪৬ লাখ ৬৮ হাজার ৮৯১ টাকা ক্ষতি হয়েছে। নিলাম দরপত্রে সর্বোচ্চ দরদাতাকে কাজ না দিয়ে ২৪ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার লোকসান করা হয়েছে। এছাড়া পটুয়াখালী প্রকল্পে আরডিপিপি অনুযায়ী কাজ না করে এবং মালামাল সরবরাহ ছাড়াই বিল পরিশোধের মাধ্যমে সরকারের ২২ লাখ ৮১ হাজার ৫৪৯ টাকা ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের পরিমাণ ৭ হাজার ৬৯৭ কোটি ১১ লাখ ৭০ হাজার ৮৩৪ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যান্য অনিয়মের মধ্যে রয়েছে বিপিডিবি’র কাছে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল সময়মতো আদায় না করায় ৫ হাজার ৬৬০ কোটি ২৯ লাখ ২৭ হাজার ২৪৮ টাকার ক্ষতি এবং চাহিদা ছাড়াই অতিরিক্ত গ্যাস বুস্টার কম্প্রেসার কিনে ৫৪ কোটি ৬৮ লাখ ৮৭ হাজার ৩৭১ টাকার লোকসান। এছাড়া প্লান্টের উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কম বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে কোম্পানি ৮ হাজার ৬৮৬ কোটি ৬২ লাখ ৪৬ হাজার ৬২৭ টাকা হারিয়েছে। তদারকির অভাবে কোম্পানির জমিতে বহিরাগতদের তেলের ডিপো নির্মাণ ও পিপিআর ২০০৮ লঙ্ঘন করে আরএফকিউ পদ্ধতিতে সিলিং সীমার অতিরিক্ত ব্যয় ও জমি লিজ দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এবং পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মো. সবুর হোসেন জানান, তিনি অডিট রিপোর্টটি দেখেননি এবং অডিট সংক্রান্ত কোনো অসঙ্গতি তাকে অবহিত করা হয়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেশের সবচেয়ে বড় এই পাওয়ার হাবে ৬টি ইউনিটের মাধ্যমে ১৬৪৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দেয়া অডিট রিপোর্ট ইস্যুকরণ চিঠিতে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে উত্থাপিত ৪৫টি অডিট মেমোর বিপরীতে অডিট কর্তৃপক্ষের জবাব ও প্রমাণকের ভিত্তিতে মোট ৪৫টি অনুচ্ছেদে রূপান্তর করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের আওতাধীন পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্টের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ,ভূমি উন্নয়ন ও সংরক্ষণ প্রকল্পে ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে দরপত্রের বর্ণিত কাজের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান না হওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদারের সঙ্গে ডিপিএম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতে অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে ৩৯০ কোটি ৭৮ লাখ ৭২ হাজার ১১৮ টাকা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ডের (ডিএলপি) মধ্যে প্লান্টের আউটেজ আওয়ার চুক্তির শর্তের অধিক হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ আদায় না করায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১১১ কোটি ৫৯ লাখ ৭২ হাজার ৭৪১ টাকা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্লান্টের অ্যানুয়েল ডিপেন্ডেবল ক্যাপাসিটি কম ঘোষণা করায় বিদ্যুৎ বিক্রয় বাবদ কোম্পানির রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ ৮ কোটি ৮৩ লাখ ১৩ হাজার ৬৪৯ টাকা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্লান্টের অনুমোদিত আউটেজ আওয়ারের অতিরিক্ত আউটেজ-এর কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কোম্পানির রাজস্ব আয়জনিত আর্থিক ক্ষতি ৬৯৮ কোটি ৯২ লাখ ৪ হাজার ৭৪০ টাকা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গ্যাস কনসাম্পশন অনুসারে বিল না করে বিপিডিবি থেকে নির্ধারিত হিট রেট অনুসারে গ্যাস বিল আদায় করায় কোম্পানির আর্থিক ক্ষতি ৬৩ কোটি ৮১ লাখ ৩৫ হাজার ৬২০ টাকা।
সূত্র: মানবজমিন



















