পরিবেশ-পর্যটন

চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারে আশার আলো বাইনগাছে

  প্রতিনিধি 21 September 2026 , 1:49:50 প্রিন্ট সংস্করণ

উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ম্যানগ্রোভ বন চকরিয়া সুন্দরবনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন আশাবাদ। সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯০৩ সালে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষিত এই বনাঞ্চলটি ১৯৫০ থেকে ১৯৬৯-৭০ সময়কালের ওয়ার্কিং প্ল্যান অনুযায়ী ২১ হাজার ১০২ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। পরে বিভিন্ন সময়ে ১৮ হাজার ৫০৮ একর জমি সংরক্ষিত বন এবং বাকি অংশকে রক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব, অপরিকল্পিত ইজারা এবং মানবিক হস্তক্ষেপে বনটি প্রায় বিলীন হয়ে যায়। গত বছর এই বনের দুর্দশা নিয়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে, বিশাল বনাঞ্চলটির জায়গায় এখন মাত্র একটি গাছ অবশিষ্ট রয়েছে।

এই হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে গত বছরের জুলাই মাস থেকে বেসরকারি সংস্থা কোডেক (কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার) বদরখালী চ্যানেলে পরীক্ষামূলকভাবে ২৫ একর জমিতে ৮০ হাজার বাইনগাছ রোপণ করেছে। প্রকল্পের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বাইনগাছের টিকে থাকার হার বেশ সন্তোষজনক। এর ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের জুন মাসে রামপুরা মৌজায় আরও ২৫ একর জমিতে ৪০ হাজার বাইনগাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। বন বিভাগ চলতি মাসের ১০ তারিখে বনায়নের জন্য এলাকা চিহ্নিত করে দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত পাহারা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

কোডেকের প্রকল্প কর্মকর্তা শীতল কুমার নাথ জানান, বদরখালী চ্যানেলে বিভিন্ন প্রজাতির ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ করা হলেও বাইনগাছের ফলন সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ম্যানগ্রোভের বিকাশে জোয়ার-ভাটার অবাধ প্রবাহ অপরিহার্য, কিন্তু চকরিয়া সুন্দরবনে চিংড়িঘেরের বাঁধের কারণে পানির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই প্রতিবন্ধকতা দূর করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, বন বিভাগের নামে চার হাজার একর বনভূমি রেকর্ড থাকলেও ইজারাগ্রহীতারা সীমানা না মানায় জমি দখল করে নিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রথম ধাপে বন বিভাগের জমি উদ্ধার করা হবে এবং পরে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ইজারা বাতিল করে জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামানের ২০১৪ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, সাদা ও মরিচা বাইনের টিকে থাকার হার অন্য প্রজাতিগুলোর তুলনায় বেশি, যার মধ্যে মরিচা বাইনের বৃদ্ধি দ্রুততর। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বন পুনর্জাগরণে চারটি প্রধান বাধা রয়েছে—ইজারাদারদের ব্যবসায়িক স্বার্থ, চিংড়িঘেরের বাঁধ, চার দশকের লবণ ও চিংড়ি চাষে নষ্ট হওয়া মাটির গুণাগুণ এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহপথের পরিবর্তন। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া বনটির প্রকৃত রূপ ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার অবকাশ রয়েছে। ইউএনইপি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেনিয়া, কোস্টারিকা, বেনিন এবং ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারে সাফল্য পেয়েছে। ভিয়েতনামের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, যুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়ে যাওয়া ৪০ হাজার হেক্টর কান জিও ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধার করতে তারা মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে নির্দিষ্ট প্রজাতির চারা রোপণ করে। ভিয়েতনাম সরকার ১৯৯৬ সালের মধ্যেই প্রায় ৩৫ হাজার একর বনভূমি পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, সরকার দেশজুড়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর যে অঙ্গীকার করেছে, চকরিয়া সুন্দরবনের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা হলে তা হবে এক অনন্য মাইলফলক। তিনি জবরদখল উচ্ছেদে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দিয়ে বলেন, বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং ধাপে ধাপে বনের পরিবেশ পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হারিয়ে যাওয়া চকরিয়া সুন্দরবন ফেরানোর আশা জাগাচ্ছে বাইনগাছ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে চকরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এই বনের অবস্থান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মাতামুহুরী নদীর কোল ঘেঁষে সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের বনটি সংঘবদ্ধ দখল ও তৎকালীন সরকারের ভুল নীতিতে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বনটি নিয়ে গত বছরের ২৪ জুলাই ‘ যে বনে একটিমাত্র গাছ ’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বন বিভাগের পক্ষ থেকে এসব গাছ রক্ষায় নিয়মিত পাহারার ব্যবস্থা করার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ বছর যে বাইনগাছগুলো লাগানো হয়েছে, সেটার ফলাফল দেখার অপেক্ষা করছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এটা কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায়, সেটা ভাবতে হবে।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content