প্রতিনিধি 14 August 2026 , 1:14:22 প্রিন্ট সংস্করণ

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ হলো রাষ্ট্রপতি। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর হাতেই মূলত নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ন্যস্ত থাকে এবং তিনি দেশ পরিচালনা করেন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপতি হন রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান বা অভিভাবক, যিনি সমগ্র জাতির ঐক্যের প্রতীক। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হলো: একজন সক্রিয়, রাজপথের পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ যখন রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসেন, তখন কি তার রাজনৈতিক জীবনের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটে? তিনি কি রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান? তার কি আর দেশের নীতিনির্ধারণে কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকে না?

সামপ্রতিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটি নতুন করে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব এবং বর্তমান সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রায় ১৬ বছর ধরে দলের অন্যতম শীর্ষ পদে থেকে যিনি রাজপথের আন্দোলন, কারাবরণ এবং রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় নিরলসভাবে সক্রিয় ছিলেন, তার বঙ্গভবনে যাওয়ার অর্থ কি একজন রাজনৈতিক যোদ্ধার চিরতরে নীরব হয়ে যাওয়া? এই কাঠামোগত রূপান্তর কি কেবলই আনুষ্ঠানিকতা, নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্র পরিচালনার এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য?
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, কার্যাবলি ও দায়বদ্ধতার রূপরেখা অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে বিধৃত হয়েছে। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলেও, পরবর্তীতে নানা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যদিয়ে এই ব্যবস্থার রদবদল ঘটে। অবশেষে ১৯৯১ সালে একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে পুনরায় সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু হয়, যেখানে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা নিরঙ্কুশভাবে থাকে প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভার হাতে। সংবিধানের ৪৮ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান এবং তিনি অন্য সকল ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করেন। রাষ্ট্রের সকল নির্বাহী কাজ, চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তার নামেই সম্পন্ন হয়। তবে, এই সর্বোচ্চ সম্মান, প্রটোকল ও জাঁকজমকের বিপরীতে তার স্বাধীন নির্বাহী ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে যে, রাষ্ট্রপতি কেবল প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ—এই দু’টি কাজ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে করতে পারেন। বাকি সকল দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়, যা সংবিধানের ৫৬ (৩) অনুচ্ছেদেও দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংসদ আহ্বান করা, স্থগিত করা ও ভেঙে দেয়া, সংসদে পাস হওয়া বিলে সম্মতি দেয়া, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, যুদ্ধ ঘোষণা, শান্তিচুক্তি অনুমোদন এবং ক্ষমা প্রদর্শন (মার্জনা) সহ প্রায় সব বিষয়েই রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মানতে বাধ্য। এমনকি প্রধানমন্ত্রী আসলেই রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিয়েছেন কিনা, তা নিয়ে কোনো আদালত প্রশ্ন তুলতে পারবে না বলেও সংবিধানে আইনি রক্ষাকবচ দেয়া আছে।
সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তার পদে প্রবেশের তারিখ থেকে পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করেন এবং কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি এই পদে অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না। এ ছাড়া, রাষ্ট্রপতি চাইলে স্পিকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদ ত্যাগ করতে পারেন। কোনো কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তবে বর্তমান জাতীয় সংসদে বিএনপি’র দুই-তৃতীয়াংশের বেশি (নিরঙ্কুশ) সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, অন্যদিকে জামায়াতসহ বিরোধীদের সদস্যসংখ্যা সংরক্ষিত নারী আসনসহ মাত্র ৯০। ফলে সংসদ সদস্যদের ভোটে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন, তা গাণিতিকভাবে সম্পূর্ণ নিশ্চিত। বাহ্যিক দৃষ্টিতে একজন সাধারণ মানুষের কাছে একে “রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা” মনে হতে পারে। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গভীরতর দৃষ্টিতে এটি নিষ্ক্রিয়তা নয়; এটি হলো “রাজনৈতিক উত্তরণ”।
রাষ্ট্রপতি পদটিকে দলীয় প্রভাবমুক্ত এবং সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ রাখার জন্য সংবিধানে সুস্পষ্ট রক্ষাকবচ যুক্ত করা হয়েছে। সংবিধানে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি তার কার্যভারকালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবেন না এবং তিনি যদি সংসদ সদস্য থাকেন, তবে রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণের দিন থেকেই সংসদে তার আসন শূন্য হয়ে যাবে। এই আইনগত বাধ্যবাধকতা একজন রাজনীতিবিদকে দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে বের করে এনে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। মির্জা ফখরুল যদি দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে পুরো জাতির অভিভাবক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, তবে তার এই আপাত “নিষ্ক্রিয়” পদটিই হয়ে উঠবে রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী নৈতিক ঢাল। “রাষ্ট্রপতি হলে কি রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে হয়?” এই প্রশ্নের উত্তর হলো দ্ব্যর্থহীন ‘না’।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির চেয়ার কখনোই সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ছিল না। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর নিরঙ্কুশ আধিপত্য এবং গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবের কারণে প্রায়শই এই পদটিকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার অপচেষ্টা হয়েছে। স্বাধীনতার পরপরই সংসদীয় ব্যবস্থায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। পরবর্তীতে সামরিক শাসনামলে রাষ্ট্রপতি পদটি অনেকটা আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালে গণ-আন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে এবং দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে। এই নতুন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির নির্বাচন জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের বদলে সংসদ সদস্যদের পরোক্ষ ভোটে নির্ধারণের বিধান করা হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনটি ছিল অত্যন্ত উত্তাপপূর্ণ। তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তারা নিরপেক্ষতার নজির স্থাপন করতে চেয়েছিল।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসে নিরপেক্ষ রাষ্ট্রপতির এক অনন্য উদাহরণ। তিনি অন্ধভাবে সরকারের তোষামোদ না করে একটি সাহসী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার সময়কালে রাষ্ট্রপতি পদটি কেবল একটি আলংকারিক চেয়ারে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তিনি রাষ্ট্রের সংকটময় মুহূর্তে সংবিধানের রক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তার এই ভূমিকা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রপতি চাইলে সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থেকেও রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে পারেন। এটিই মূলত সেই রাজনৈতিক উত্তরণ, যা একজন পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রপতির আসনে বসার পর নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মনোনয়নে মো. সাহাবুদ্দিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের নজিরবিহীন ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। সেই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হওয়ার বিষয়টি কেবল একটি দলীয় মনোনয়ন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির এক নতুন পরীক্ষার নাম। তিনি যদি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক মর্যাদা সমুন্নত রাখতে পারেন, তবেই তিনি সফল হবেন। তার সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেকে একজন নিরপেক্ষ অভিভাবক হিসেবে প্রমাণ করা। যদি তিনি তা করতে সক্ষম হন, তবেই তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন ধারার সূচনা করতে পারবেন। তার এই উত্তরণ কেবল তার নিজের নয়, বরং পুরো দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে। পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসেও একজন রাজনীতিবিদ দেশের নীতিনির্ধারণে পরোক্ষভাবে নৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে পারেন, যা তাকে নিষ্ক্রিয় নয়, বরং রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিভাবকে পরিণত করে।
সংবিধানের ৫২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের দায়ে সংসদ সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন (ওসঢ়বধপযসবহঃ) করারও বিধান রয়েছে।
পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ২৪শে জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা বাতিল করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়, যেখানে সমস্ত ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।
১৯৭৮ সালের ৩রা জুলাই দেশে প্রথম সরাসরি বা সাধারণ ভোটাধিকারের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন।
এরপর দীর্ঘদিন সামরিক ও আধা-সামরিক শাসনে জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক ফরমান ও ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন ছিলেন।
তার মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালের নির্বাচনে ৩৯ জন প্রার্থীর মধ্যে বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন পায়নি (১৪০টি আসন পেয়েছিল), ফলে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে।
কিন্তু আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য বিরোধী দল তার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার গুরুতর অভিযোগ তোলে এবং দাবি করে যে, দলীয় রাজনীতিকের বদলে একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি করা উচিত।
রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে একত্রিত করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে প্রার্থী করে।
যদিও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে আবদুর রহমান বিশ্বাসই জয়লাভ করেন।
তবে আবদুর রহমান বিশ্বাস তার মেয়াদকালে ১৯৯৬ সালের সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ করে দিয়ে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতার অসামান্য প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন, যা তাকে বিশেষ মর্যাদা দেয়।
সাহাবুদ্দিনের সাংবিধানিক ও নৈতিক অবস্থান চরম সংকটে পড়ে।
একদিকে তিনি শেখ হাসিনাকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দেন, অন্যদিকে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র তার কাছে নেই বলে বিতর্কিত মন্তব্য করে ব্যাপক জনরোষের শিকার হন।
সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের এমন সব ভয়াবহ অভিযোগ সামনে আসে, যা দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।
শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে, মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক আগেই ২০২৬ সালের ২৪শে জুলাই তিনি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
সংবিধান অনুসারে স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়।
নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করে এবং ১৩ই আগস্ট ২০২৬ তারিখ বিকাল ৪টার মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করে।
এই চরম রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে দেশের রাজনীতিতে একটি বড় ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
১৩ই আগস্ট দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বৈঠক কক্ষে দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ও স্থায়ী কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে এই ঘোষণা আসে।
বিএনপি’র জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আনুষ্ঠানিকভাবে মির্জা ফখরুলের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন এবং মির্জা ফখরুল স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেন।
তিনি শুধু একজন সাধারণ রাজনীতিক নন; তিনি ২০১১ সাল থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে দলের জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নিযুক্ত হয়ে প্রায় ১৬ বছর ধরে এই গুরুদায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং তারেক রহমানের লন্ডনে নির্বাসনের পুরোটা সময় তিনি অসীম ধৈর্যের সঙ্গে দলের হাল ধরেছিলেন।
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন।
শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে হবে এবং কার্যভার গ্রহণের দিন সংসদে তার ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি শূন্য ঘোষিত হবে, যেখানে পরবর্তীতে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদে ভোটাভুটি হতে যাচ্ছে।
এর আগে ১৯৯১ সালে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছিল।
২০২৬ সালের এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করা হয়েছে।
তিনি আর দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন না, বিরোধী দলের সমালোচনা করবেন না বা দলীয় মিছিলে নেতৃত্ব দেবেন না।
যিনি সারাজীবন প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে বক্তৃতা দিয়েছেন, তাকে হঠাৎ করে সকল দলের প্রতি সমদর্শী হতে হয়।
রাষ্ট্রপতি হওয়া মানে একজন রাজনীতিকের ক্যারিয়ারের মৃত্যু নয়।
সূত্র: মানবজমিন



















