আন্তর্জাতিক

ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত: প্রধান পক্ষসমূহ ও জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণের আদ্যোপান্ত

  প্রতিনিধি 14 September 2026 , 10:30:52 প্রিন্ট সংস্করণ

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলমান ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ বর্তমানে এক নতুন উত্তাপ ছড়াচ্ছে। ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে। একই সঙ্গে তারা দক্ষিণ সৌদি আরব লক্ষ্য করেও হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। এই সংঘাত এখন কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধে আটকে নেই; বরং এতে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি ও সশস্ত্র গোষ্ঠী জড়িয়ে পড়ায় এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম জটিল সংকটে পরিণত হয়েছে।

হুতিরা, যারা ‘আনসার আল্লাহ’ নামেও পরিচিত, বর্তমানে রাজধানী সানা-সহ ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার শিকার হয়েও গোষ্ঠীটি তাদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সামরিক অভিযানের পরও তাদের সক্ষমতা পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হুতিদের পরিচিতি বিশ্বমঞ্চে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। গাজার প্রতি সংহতির নামে তারা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে আক্রমণ ও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো শুরু করে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক রুটে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচল ও বৈশ্বিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা সংঘাতকে একটি আঞ্চলিক থেকে বৈশ্বিক নিরাপত্তাজনিত ইস্যুতে রূপ দিয়েছে।

ইয়েমেনের যুদ্ধে ২০১৫ সালে সৌদি আরব সরাসরি সামরিকভাবে যুক্ত হয়। রিয়াদের নেতৃত্বে গঠিত জোটের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় বসানো। দীর্ঘ সামরিক অভিযান সত্ত্বেও হুতিদের ভিত্তি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি এবং দেশটিতে এক ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। তবে ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়ার পর রিয়াদের অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যায়। বর্তমানে রিয়াদ সরাসরি সামরিক সংঘাতের চেয়ে রাজনৈতিক সমাধানের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছে সৌদি-সমর্থিত ‘প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল’ বা পিএলসি। ২০২২ সালে গঠিত এই কাউন্সিলের প্রধান দায়িত্ব হলো দেশ পরিচালনা ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতির আলোচনাকে সফল করা। পিএলসিতে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেনের রাজনৈতিক নেতা ও সামরিক পটভূমির ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এই কাউন্সিলের ভেতরেও রাজনৈতিক স্বার্থের ভিন্নতা থাকায় হুতিদের মোকাবিলায় একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ধরে রাখা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘ইসলাহ’ বা ইয়েমেনি কংগ্রেগেশন ফর রিফর্ম একটি অন্যতম শক্তি। মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কযুক্ত এই সুন্নি রাজনৈতিক আন্দোলনটি পিএলসি-নেতৃত্বাধীন সরকারের একটি অংশ হলেও এর নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে। হুতিবিরোধী হিসেবে পরিচিত হলেও পিএলসির অন্যান্য মিত্রদের সঙ্গে এদের অনেক বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।

এছাড়া হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত আরেক প্রভাবশালী সামরিক শক্তি হলো ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস’। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর ভাতিজা তারেক সালেহ এই বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ইয়েমেন সরকার ও সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা এই বাহিনী হুতিবিরোধী জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পিএলসির কাঠামোতে বিভিন্ন শক্তিকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

ইয়েমেনের বর্তমান বাস্তবতায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা শুধু হুতি ও সরকারের মধ্যে সমঝোতার ওপর নির্ভর করে না। পিএলসি, ইসলাহ ও ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের মতো বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থ, উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক বিভাজন এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখানে বড় ফ্যাক্টর। সৌদি ও ইরানসহ আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ও ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো—সবকিছুর সমন্বিত সমাধানই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের একমাত্র পথ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু এসব সামরিক অভিযান গোষ্ঠীটির সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর ফলে দুই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে তুলনামূলক বাস্তববাদী ও কম সংঘাতপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content