Uncategorized

বাংলা কিউআর কোডের অপব্যবহার: মার্চেন্টদের মাধ্যমে নগদ উত্তোলনে ঝুঁকিতে ২০ লাখ এজেন্ট

  প্রতিনিধি 14 September 2026 , 3:55:48 প্রিন্ট সংস্করণ

ডিজিটাল লেনদেনকে সহজ করার লক্ষ্যে চালু হওয়া ‘বাংলা কিউআর’ কোড এখন নিয়মবহির্ভূত নগদ অর্থ উত্তোলনের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। পণ্য বা সেবা বিক্রি না করেই অনেক বিক্রেতা বা মার্চেন্ট গ্রাহকদের সরাসরি নগদ টাকা তুলে দেওয়ার সুবিধা দিচ্ছেন। এতে মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) খাতের দীর্ঘদিনের চেষ্টায় গড়ে তোলা ইকোসিস্টেম বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। সারা দেশে বর্তমানে এমএফএস খাতে প্রায় ২০ লাখ এজেন্ট কর্মরত রয়েছেন, যারা এখন ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

এমএফএস ইকোসিস্টেমে এজেন্টের মাধ্যমে নগদ অর্থ উত্তোলনে গ্রাহককে নির্দিষ্ট হারে মাশুল বা ফি দিতে হয়, যা হাজারে ১২ টাকা ৯০ পয়সা থেকে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত হয়ে থাকে। যেমন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সীমা অনুযায়ী কোনো গ্রাহক ৩০ হাজার টাকা নগদ উত্তোলন করলে তাঁকে সর্বনিম্ন ৩৮৭ টাকা ফি দিতে হয়। অথচ মার্চেন্টদের মাধ্যমে কিউআর কোড ব্যবহার করে একই পরিমাণ অর্থ তুললে অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের কোনো খরচই লাগছে না। ফলে এজেন্টরা তাদের স্বাভাবিক লেনদেন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত জুলাই মাসে বাংলা কিউআর কোড বাধ্যতামূলক করে। এর ফলে ব্যাংক ও এমএফএসগুলো নিজস্ব কোডের পরিবর্তে সব মার্চেন্টের জন্য অভিন্ন কোড স্থাপন করছে। এখন পর্যন্ত দেশজুড়ে ৩৫ লাখ মার্চেন্ট এই কিউআর কোড সুবিধা যুক্ত করেছে এবং কিউআর কোডে দৈনিক গড়ে ১৩৭ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। তবে সুবিধাটির অপব্যবহার করতে গিয়ে কিছু মার্চেন্ট এক ব্যাংক বা এমএফএস হিসাবের বিপরীতে ৪ থেকে ৫টি পর্যন্ত কিউআর কোড নিয়েছেন।

অনিয়মের চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের লেনদেন পর্যালোচনায়। নেত্রকোনার এক গ্রাহক জাকিয়া আফরিন গত ১৪ থেকে ১৮ আগস্টের মধ্যে দুটি ব্যাংকের কিউআর কোড ব্যবহার করে ৩৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৯০ টাকা উত্তোলন করেন। পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ে দেখা গেছে, এসব গ্রাহকের মুঠোফোন নম্বর বন্ধ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে খোলা হিসাবগুলো অন্য কারো নামে নিবন্ধিত। মূলত প্রবাসী আয় কিংবা ব্যাংক থেকে জমা হওয়া টাকা এভাবে মার্চেন্টের মাধ্যমে নগদে রূপান্তর করা হচ্ছে, যার প্রেরক ও গন্তব্য অস্পষ্ট।

এমএফএসগুলোর তথ্য অনুযায়ী, একজন গ্রাহক এজেন্ট থেকে টাকা জমা দিয়ে তা ডিজিটাল টাকায় রূপান্তর করলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কমিশন বাবদ অন্তত ৬ টাকা ৪০ পয়সা খরচ করতে হয়। অথচ বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনে প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো মুনাফা পায় না, উল্টো লোকসান গুনতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, কিউআর কোড লেনদেনে প্রতি হাজারে এমএফএসের লোকসান হয় কমপক্ষে ৩০ পয়সা এবং ব্যাংকের খরচ বাদে আয় হয় মাত্র ১৭ পয়সা। সরকার ভ্যাট ও এআইটি বাবদ প্রতি হাজারে ২ টাকা ৯১ পয়সা পেয়ে থাকে।

আগামী অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআর ব্যবহারের খরচ মার্চেন্টদের জন্য শূন্য করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে এ ধরনের নগদ উত্তোলনের প্রবণতা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও নগদের সাবেক চেয়ারম্যান কে এ এস মুরশিদ মনে করেন, ডিজিটাল লেনদেনের বিশ্বজনীন মডেল অন্ধভাবে অনুসরণ না করে বাংলাদেশের উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত এমএফএস কোম্পানিগুলোকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী জানান, মার্চেন্টের মাধ্যমে নগদ অর্থ উত্তোলন সেবা অবশ্যই বন্ধ করা উচিত। কারণ এতে লেনদেনের স্বচ্ছতা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। অপর দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, বাংলা কিউআর কোড মানুষের জীবন সহজ করার জন্য করা হয়েছে। তবে এর কোনো অপব্যবহার হলে তা আইনের আওতায় আনা হবে এবং অপব্যবহার রোধে মার্চেন্টভিত্তিক লেনদেনের সীমা বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এজেন্টদের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিয়েছে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সীমার বাইরে গ্রাহক বড় অঙ্কের অর্থ ক্যাশ আউটের সুযোগ পাচ্ছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তারা বলছে, বাংলা কিউআর কোডের অপব্যবহারের কারণে শুধু এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর ইকোসিস্টেমই নষ্ট হচ্ছে তা নয়, বরং এই অপব্যবহারের কারণে অর্থ পাচারের মতো নানা ঘটনার সুযোগও তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গ্রামগঞ্জের দোকানদার থেকে শুরু করে বড় বড় সেবা ও পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান এই মার্চেন্টের তালিকায় রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই ফি বাবদ এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো যে অর্থ পায় তার মধ্যে প্রতি হাজারের জন্য সরকারকে রাজস্ব দেয় ৩ টাকার বেশি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে বাংলা কিউআর চালুর পর পূর্ণাঙ্গভাবে তা শুরু করা দরকার ছিল।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content