প্রতিনিধি 14 September 2026 , 4:26:12 প্রিন্ট সংস্করণ

‘যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ’—এই প্রবাদটি কি কেবলই একটি রূপকথা, নাকি ক্ষমতার বাস্তব চরিত্র অনুধাবনের নির্মম রাজনৈতিক সত্য? যারা অতীতে ক্ষমতার পুরোনো ও দূষিত সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রাজপথে সোচ্চার ছিলেন, আজ তারাই যদি একই ধরনের গুরুতর অভিযোগের কেন্দ্রে চলে আসেন, তখন জনমনে स्वाभाविकভাবেই প্রশ্ন জাগে—ব্যবস্থা কি আদৌ বদলেছে, নাকি কেবল ক্ষমতার আসনে থাকা ব্যক্তিদের মুখচ্ছবি পরিবর্তিত হয়েছে?

সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধানে নেমেছে। তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ, নিয়োগ-বাণিজ্য, বদলি ও পদায়নে অনিয়ম, টেন্ডার কারসাজি এবং বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। বিষয়টি রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির গণ্ডি ছাড়িয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ এক সংকটে রূপ নিয়েছে। তবে অভিযোগের ভয়াবহতা যেমন সত্য, তেমনি উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করাও বিচারিক নৈতিকতার পরিপন্থী। তাই এখনকার মূল দাবি হলো, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে কেবল প্রমাণ ও তথ্যের ভিত্তিতেই এই অভিযোগের বিচার হতে হবে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং সারা দেশে ৩৬ জন জেলা প্রশাসক পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ হারে কমিশন আদায়ের অভিযোগও সামনে এসেছে। নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার-বাণিজ্যেও তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে। শুধু দেশীয় নয়, বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগগুলোও বেশ সুনির্দিষ্ট। দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের দাবি করা হয়েছে। পর্তুগালে জমি ক্রয়, দুবাইয়ে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখার মতো গুরুতর অভিযোগগুলো যাচাই করা জরুরি। দুদকের জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা, কারণ এসব তথ্যের সত্যতা ব্যাংক নথি, সম্পদের দলিল, কোম্পানির রেকর্ড এবং সরকারি নথিতে থাকার কথা।
আসিফ মাহমুদের জন্যও এটি তাঁর রাজনৈতিক সততার বড় পরীক্ষা। তিনি যদি এসব অভিযোগকে মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মনে করেন, তবে সবচেয়ে জোরালো জবাব হতে পারে তদন্তকে স্বচ্ছতার সাথে স্বাগত জানানো এবং নথিপত্র জনসমক্ষে উপস্থাপন করা। তিনি সরাসরি বলতে পারেন, “প্রমাণ করুন।” মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে ১এমডিবি (1MDB) কেলেঙ্কারির বিচারিক প্রক্রিয়া দেখিয়েছে যে, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিকেও আইনের সামনে দাঁড়াতে হয়। মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম দুর্নীতির প্রশ্নে আপসহীন থেকে বলেছেন, “I never compromise on the issue of corruption.” একই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মাহাথির মোহাম্মদের ভাষায়, রাষ্ট্রের শীর্ষে থাকা ব্যক্তি দুর্নীতিগ্রস্ত হলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়। যখন ঘুষ দেওয়া-নেওয়া, টেন্ডার কমিশন এবং দলীয় আনুগত্য নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়, তখনই একটি দুর্নীতির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন প্রজন্মের কাছে মানুষের বড় প্রত্যাশা ছিল একটি স্বচ্ছ ও নৈতিক রাজনীতির। তাদের মূল পুঁজিই ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান। ফলে এখন যখন তাদেরই কারো বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তখন শুধু সেই ব্যক্তির অস্তিত্ব নয়, বরং পুরো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়। মানুষ দেখতে চায়, আমরা কি আসলেই নতুন কোনো ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছি, নাকি কেবল পুরোনো রাজনীতিরই পুনরাবৃত্তি দেখছি?
আসিফ মাহমুদ দোষী প্রমাণিত হলে তাঁকে অবশ্যই বিচারের আওতায় আসতে হবে, আবার নির্দোষ হলে তদন্ত শেষে দায়মুক্তির সুযোগও তাঁর প্রাপ্য। দুদককেও এটি প্রমাণ করতে হবে যে, এই অনুসন্ধান কোনো রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংসের অপচেষ্টা নয়, আবার কাউকে রাজনৈতিক পরিচয়ে সুরক্ষা দেওয়ার রক্ষাকবচও নয়। যদি রাজনৈতিক আনুগত্য দেখে দুর্নীতির বিচার করা হয়, তবে দুর্নীতিবিরোধী লড়াই কখনোই সফল হবে না। বরং বাছাইমূলক ন্যায়বিচার বা ‘সিলেক্টিভ জাস্টিস’ আমাদের দুর্নীতির দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি দেবে না, কেবল দুর্নীতির মালিকানা বদলাবে।
দিনশেষে রাষ্ট্রের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ক্ষমতার চেয়ে জবাবদিহিকে বড় করে তোলা। মিথ্যা অভিযোগের দায় যেমন নির্ধারণ করতে হবে, তেমনি প্রমাণ পাওয়া গেলে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। যদি এই রাষ্ট্র প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী না বানায়, আবার প্রমাণ পাওয়ার পর কাউকে ছাড় না দেয়, তবেই সেটি নতুন বাংলাদেশের চরিত্র ফুটে উঠবে। ১১ হাজার কোটি টাকার পাচারের অভিযোগ সত্য কি না, তা যাচাইয়ের পাশাপাশি আমাদের জানতে হবে—এই রাষ্ট্র কি সত্যিই ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে অটল থাকতে পারবে? প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এখানে রাজনৈতিক উত্তেজনার চেয়ে জরুরি একটি বিষয় আছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কে অনুমোদন দিয়েছেন, কে অর্থ নিয়েছেন, কার মাধ্যমে অর্থ বিদেশে গেছে, তারও আর্থিক লেনদেনের একটি রেকর্ড থাকার কথা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারণ রাজনৈতিক বক্তৃতা সন্দেহ দূর করে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: 1MDB কেলেঙ্কারি বিশ্বকে দেখিয়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক নেটওয়ার্ক একসঙ্গে কাজ করলে দুর্নীতি কী ভয়ংকর মাত্রা নিতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একসময় যিনি দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের একজন ছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁকেও বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই কথাটির গুরুত্ব অনেক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দুর্নীতির প্রশ্নে আপস না করার অর্থ হলো, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের দলের কি না, ক্ষমতাবান কি না, জনপ্রিয় কি না, আন্দোলনের পুরোনো মুখ কি না—এসব বিবেচনা না করে তদন্ত করা।
সূত্র: মানবজমিন



















