প্রতিনিধি 15 September 2026 , 2:50:42 প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কাটাসুর এলাকার বাসিন্দা মো. আলমগীর একজন রিকশাচালক। দীর্ঘ ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনির ফাঁকে তাকে দিনে তিন-চারবার নাশতা করতে হয়। এতদিন নাশতার অংশ হিসেবে একটি বনরুটি ও এক কাপ দুধ চায়ের পেছনে তার ব্যয় হতো ২০ টাকা। তবে গত রোববার থেকে এই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ টাকায়। মূলত বাজারে প্রতিটি বনরুটির দাম ৫ টাকা বৃদ্ধির কারণেই তার প্রতিদিনের নাশতার খরচ বেড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধুমাত্র মোহাম্মদপুর নয়, মিরপুর, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার, মগবাজার ও খিলগাঁওয়ের মতো ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বাড়তি দামে রুটি ও কেক বিক্রি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দাম না বাড়ালেও পণ্যের আকার ও ওজন কমিয়ে ক্রেতাদের ঠকানো হচ্ছে। যেমন, আগে যেসব বনরুটি বা মাফিন কেকের ওজন ছিল ৪০ গ্রাম, তা কমিয়ে ৩৫ গ্রাম করা হয়েছে। আবার ১২ টাকা দামের অনেক রুটি এখন ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যদিও আকার কিছুটা বড় করা হয়েছে। সাধারণ মানের বিস্কুটের দামও কেজিতে গড়ে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে; ১৩০ টাকার বিস্কুট এখন ১৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি মো. জালাল উদ্দিন জানান, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে উৎপাদন খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ভাষ্যমতে, রুটি ও কেক তৈরির উপকরণের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে গত শনিবার থেকে সমিতি পণ্যমূল্য ও ওজনে সমন্বয় এনেছে। এতে সামগ্রিকভাবে ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে। এর আগে, নিজেদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার রাজধানীর অনেক বেকারি কারখানা উৎপাদন বন্ধ রেখেছিল। দুই দিন বন্ধ থাকার পর শনিবার থেকে নতুন নির্ধারিত মূল্যে পণ্য সরবরাহ শুরু হয়।
বেকারি মালিকদের দেওয়া তথ্যমতে, গত দেড়-দুই বছরে ময়দা, চিনি, ডালডা, সয়াবিন তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাস আগের তুলনায় খোলা ময়দার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ, চিনির দাম গড়ে ১১ শতাংশ এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৫ শতাংশ বেড়েছে। জালাল উদ্দিনের দাবি, গত এক বছরে কাঁচামাল ও জ্বালানি সংকটে উৎপাদন খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়েছে, অথচ বিপরীতে পণ্য উৎপাদন কমেছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ।
দেশের প্রায় ৭ হাজার ক্ষুদ্র বেকারির মধ্যে রাজধানীতেই রয়েছে প্রায় ৭০০টির বেশি। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি নিয়ে বড় চাপে থাকা ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই চাপ এখন খুচরা বাজারে প্রতিফলিত হচ্ছে। মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব সড়কের চা বিক্রেতা জব্বার শেখের মতে, একদিকে চা পাতা ও চিনির বাড়তি দাম, অন্যদিকে রুটি-কেকের মূল্যবৃদ্ধি তার ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, গত আগস্ট মাসে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। এমনিতে মাছ, মাংস ও সবজির মতো নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমূল্যে সাধারণ মানুষ হিমশিম খাচ্ছে, তার ওপর বেকারি পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে খেটে খাওয়া মানুষের কষ্ট আরও চরমে পৌঁছেছে। রিকশাচালক আলমগীরের মতো নিম্নবিত্তদের কাছে শরীরে শক্তি ধরে রাখার জন্য এই স্বল্পমূল্যের খাবারগুলোই ভরসা ছিল, কিন্তু এখন সেই খরচও নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, রাজধানীর বাজারে দাম বাড়লেও ঢাকার বাইরের সব অঞ্চলে এখনো এই চিত্র দেখা যায়নি। বরিশাল, চট্টগ্রাম, সাভার ও রাজশাহীর মতো অনেক এলাকায় রোববার পর্যন্ত আগের দামেই বনরুটি ও কেক বিক্রি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে রাজধানী কেন্দ্রিক এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অচিরেই অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সকাল-বিকেল মিলিয়ে দিনে ১০-১২ ঘণ্টা পায়ে টানা রিকশা চালান তিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ কারণে তাঁরাও ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে দাম বাড়িয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রিকশাচালক আলমগীর বলেন, ‘দুইডা খেপ (ভাড়া) মাইরা একটা রুটি, একটা চা খাওনই লাগে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব সড়কের চা বিক্রেতা জব্বার শেখ বলেন, ‘গত এক মাসে চা পাতার দাম কেজিতে ৫০ টাকা বেড়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সব মিলিয়ে বড় ধরনের চাপে রয়েছেন দেশের ছোট ও মাঝারি আকারের বেকারি ব্যবসায়ীরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাই বাধ্য হয়েই আমরা এই মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’।
সূত্র: প্রথম আলো



















