সারাদেশ

শেখ হাসিনার ছায়া ও ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক: নতুন সমীকরণের সন্ধানে দুই দেশ

  প্রতিনিধি 11 August 2026 , 11:30:59 প্রিন্ট সংস্করণ

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে আবারও অস্বস্তি ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। গত সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার দেওয়া কিছু বক্তব্য দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে।

নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা, তার ছেলে এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তাদের দাবি, শিক্ষার্থীদের সেই আন্দোলনকে একটি স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহার করেছে। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, বর্তমান বাংলাদেশে ইসলামপন্থি উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসীরা অবাধে কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে।

শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের এসব বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার। ঢাকা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নয়াদিল্লিতে বসে এমন বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়াটা অনাকাঙ্ক্ষিত। একই সঙ্গে, বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানোর দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ। সোমবার ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকেও এই প্রত্যর্পণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে।

শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফিরে আসার ইঙ্গিতের পর নয়াদিল্লির জন্য পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। ভারতের নীতি-নির্ধারকদের এখন সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। একদিকে পুরোনো মিত্রকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করা কঠিন, অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর ভেটো দেওয়ার সুযোগ দেওয়াও ভারতের জন্য কৌশলগত ভুল হতে পারে।

ভারতের জন্য এই ভারসাম্য রক্ষা করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। শেখ হাসিনার কট্টর সমালোচকদের বড় একটি অংশ ভারতবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত। তাদের অভিযোগ, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে সংঘটিত দমন-পীড়ন ও অনিয়মের পেছনে ভারতের সমর্থন ছিল। নয়াদিল্লি ভালোভাবেই অবগত যে, যারা শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবিতে সোচ্চার, তাদের অনেকেই তাকে ভারতের ‘প্রক্সি’ হিসেবে দেখেন। ফলে তাদের সঙ্গে আপস করা ভারতের জন্য সহজ নয়, আবার তাদের সহজেই ভারতের অংশীদার হিসেবে পাওয়ার ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়।

তবে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দেয় যে, সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি পথ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন করে সাজানোর সুযোগ তৈরি করেছে, যা উভয় দেশের সরকারই কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।

এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো, ঢাকা ও নয়াদিল্লি শেখ হাসিনার দীর্ঘ ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে পারে কি না। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও ভবিষ্যতমুখী করতে হলে উভয় পক্ষকে এই অতীত কেন্দ্রিক জটিলতা কাটিয়ে উঠতে হবে।

দুই দেশ যদি এই পথে এগোতে পারে, তবে সীমান্তের দুই পাশের উত্তেজনা প্রশমিত হওয়া সম্ভব। কূটনৈতিক জটিলতা এড়াতে এই মুহূর্তে স্পষ্ট অবস্থান, পারস্পরিক সংযম এবং শান্তিপূর্ণ আলোচনার কোনো বিকল্প নেই।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content