প্রতিনিধি 4 August 2026 , 5:17:33 প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। তবে দিল্লির সামনে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতি। ভারত দুই দেশের মধ্যকার অতীতের উত্তেজনা ভুলে নতুন অধ্যায় শুরুর বার্তা দিলেও, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান নিয়ে তৈরি হওয়া অমীমাংসিত ইস্যুটি সম্পর্কের পথে বড় বাধা। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন, যা ঢাকার জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। ভারতের টেলিগ্রাম পত্রিকায় ফয়সাল মাহমুদের প্রতিবেদনে এই জটিল সমীকরণ উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের উদ্বেগ কমাতে ভারত সরকার দেশটির সংসদীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে জানিয়েছে, শেখ হাসিনাকে কেবল মানবিক কারণে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। তাকে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে দেয়া হবে না এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যর্পণ অনুরোধটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা করছে। তবে এই আশ্বাস ঢাকার কাছে খুব একটা গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না। কারণ, এই বক্তব্যের কয়েক সপ্তাহ আগেই শেখ হাসিনা ভারতের মাটি থেকেই রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন এবং বিচারের মুখোমুখি হতে দেশে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও দুই দেশের সম্পর্কের প্রাথমিক উষ্ণতা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারত এখনও ছোট প্রতিবেশীদের সীমিত ছাড় ও কৌশলগত চাপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের পুরোনো নীতিতে অটল। অথচ শেখ হাসিনার আমলে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা ভারতের জন্য সহায়ক ছিল, তা এখন বদলে গেছে। বর্তমান বাংলাদেশ ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে, যেখানে এক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
এই পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিদেশ সফরের তালিকায়। প্রথা ভেঙে তিনি ভারত নয়, বরং প্রথমে মালয়েশিয়া ও পরে চীন সফর করেছেন। বেইজিংয়ে তিনি বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া নয়, বরং ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প অংশীদার তৈরির কৌশল। ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের আমন্ত্রণ নিয়েও দুই দেশে ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে; ভারতের কিছু গণমাধ্যম একে ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ বললেও, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তিনি বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবেই আমন্ত্রিত হয়েছেন।
কূটনৈতিক প্রটোকলের এই পার্থক্য দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতায় প্রভাব ফেলছে। ২০২৩ সালে জি-২০ সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যদিও বাংলাদেশ ওই জোটের সদস্য নয়। বিপরীতে তারেক রহমানকে আঞ্চলিক সংস্থার প্রতিনিধির পরিচয়ে আমন্ত্রণ জানানোয় অনেকের ধারণা হয়েছে যে, ভারত বাংলাদেশের রাষ্ট্রের চেয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গেই বেশি ঘনিষ্ঠ ছিল। এই ব্যক্তিনির্ভর কূটনীতিই এখন ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারত সীমান্ত নিরাপত্তা, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন ও ট্রানজিট সুবিধা পেলেও, জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছিল, যা এখন সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় বাধা।
বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভিসা সেবা পুনরায় চালু ও উচ্চপর্যায়ের সংলাপের আলোচনা চললেও অগ্রগতি সীমিত। ভারতের সংসদীয় কমিটি বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত ভিসা সেবা স্বাভাবিক করা ও ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের সুপারিশ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ভৌগোলিক নৈকট্য ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের বড় সুবিধা পেলেও, ভবিষ্যতে সম্পর্ক টেকসই করতে হলে ব্যক্তিনির্ভর কূটনীতি থেকে সরে এসে সার্বভৌম সমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হবে। অন্যথায়, দিল্লি যদি বাংলাদেশকে সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে না দেখে, তবে ঢাকা বিকল্প অংশীদারদের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়বে।
সূত্র: মানবজমিন


















