প্রতিনিধি 22 August 2026 , 6:50:50 প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির দীর্ঘ পথচলায় সংবাদপত্র কেবল একটি শিল্প নয়, বরং জাতির বিবেক ও রাষ্ট্রের আয়না হিসেবে কাজ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি, বৈষম্য ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা তুলে ধরার মাধ্যমে সংবাদপত্র রাষ্ট্রের ভুলত্রুটি সংশোধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্র শিল্প এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, যা কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এর ব্যবসায়িক মডেলের সীমাবদ্ধতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

গবেষকদের মতে, বর্তমান যুগ হলো ‘Attention Economy’ বা মনোযোগের অর্থনীতি। তথ্যের প্রাচুর্যের এই সময়ে মানুষের মনোযোগ ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের ওপর মানুষের আস্থার হার মাত্র ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে সংবাদ এড়িয়ে চলার প্রবণতাও বাড়ছে। তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ প্রথাগত সংবাদপত্রের বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন ভুয়া তথ্যের বিস্তার ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তাকেও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সংবাদপত্র শিল্পের এই সংকটের পেছনে মানবসম্পদ সংকট একটি বড় কারণ। পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা, চাকরির অনিশ্চয়তা, কম বেতন এবং প্রশিক্ষণের অভাবের কারণে অনেক দক্ষ সাংবাদিক অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বা ডেটা জার্নালিজমের মতো জটিল কাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ ও দক্ষ জনবলের প্রয়োজন, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একজন সাংবাদিক যখন নিজের জীবিকা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তখন তাঁর কাছ থেকে মানসম্মত ও গভীর অনুসন্ধানী কাজ আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, উন্নত দেশগুলো সংবাদপত্রকে কেবল বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়নি। নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলো সংবাদপত্রকে গণতান্ত্রিক অবকাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা ও কর-সুবিধা প্রদান করে। অস্ট্রেলিয়া প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে সংবাদ কনটেন্ট ব্যবহারের বিনিময়ে অর্থ প্রদানে বাধ্য করেছে, আবার কানাডা স্থানীয় সাংবাদিকতা রক্ষায় বিশেষ প্রণোদনা চালু করেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সংবাদপত্রকে জনস্বার্থমূলক সেবা হিসেবে সুরক্ষা দেওয়া হয়, যা প্রমাণ করে যে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংবাদপত্রের এই সংকট কেবল মালিক বা সাংবাদিকদের সমস্যা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের তথ্য-নিরাপত্তা ও নাগরিক সমাজের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জাতীয় ইস্যু। রাস্তা, সেতু বা বন্দরের মতো স্বাধীন ও টেকসই সংবাদমাধ্যম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক অবকাঠামো। এই অবকাঠামো দুর্বল হলে সুশাসন ও জবাবদিহিতা হ্রাস পায় এবং গুজবের কাছে সত্য পরাজিত হয়। তাই সংবাদপত্রকে টিকিয়ে রাখা কোনো খাতভিত্তিক দাবি নয়, বরং এটি জাতির দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ রক্ষার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ।
ইতিহাস সাক্ষী, সংবাদপত্র দুর্বল হলে শুধু একটি শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং একটি জাতির সত্য জানার অধিকার খর্ব হয়। তাই সময় এসেছে সংবাদপত্র শিল্পকে নতুন করে মূল্যায়ন করার এবং একে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে টিকিয়ে রাখার কার্যকর পথনকশা তৈরির। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাষ্ট্রের বহু ইতিবাচক অর্জন যেমন সংবাদপত্রের পাতায় স্থান পেয়েছে, তেমনি অসংখ্য ভুল-ত্রুটি সংশোধনের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে সাংবাদিকতার মাধ্যমে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংকটের প্রকৃতি: শুধু অর্থের নয়, মডেলেরও। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মানুষের হাতে তথ্যের অভাব নেই; বরং তথ্যের আধিক্য রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে ডিজিটাল যুগেও এসব দেশে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি।
সূত্র: মানবজমিন








