প্রতিনিধি 3 August 2026 , 12:47:02 প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েটের এক শহরতলিতে ডেমোক্রেটিক দলের সিনেট পদপ্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদের এক নির্বাচনী প্রচার সভায় সমর্থকেরা চিৎকার করে স্লোগান দিচ্ছিল—‘আইপ্যাক নিপাত যাক।’ এই দৃশ্যটি কেবল একটি নির্বাচনী সভার চিত্র নয়, বরং এটি ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু এবং নির্বাচনী অর্থায়নের গভীর সংকটের একটি প্রতিফলন। বিশ্লেষকদের মতে, এই লড়াইয়ের ফলাফল ভবিষ্যতে বহু বছর ধরে ডেমোক্রেটিক পার্টির নীতি ও অবস্থানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

গত শুক্রবার ডেট্রয়েটের শহরতলি ডিয়ারবোর্নের ওই জনসভায় মিশিগান রাজ্য আইনসভার সদস্য আলাবাস ফারহাত বলেন, ভোটাররা আবদুল আল-সাইয়েদকে মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত করে এই ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীর লাখ লাখ ডলার ‘জলে ফেলবে’। জনসভায় ফারহাত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থা বহুদিন ধরে আমাদের বলে আসছে যে আধুনিক স্কুলের জন্য আমাদের টাকা নেই; পানের উপযোগী পরিষ্কার পানি, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা সাশ্রয়ী আবাসনব্যবস্থার জন্য আমাদের টাকা নেই। অথচ গাজায় শিশুদের ওপর বোমা ফেলার জন্য কিংবা দক্ষিণ লেবাননে জাতিগত নিধন অভিযান চালানোর জন্য যখন অর্থের প্রয়োজন হয়, তখন এই প্রশাসন ঠিকই সেই অর্থ খুঁজে পায়।
এই জনসভায় বারবার আইপ্যাকের নাম তোলা হয় এবং তাদের তীব্র নিন্দা জানানো হয়। ফেডারেল ইলেকশন কমিশন (এফইসি)-এর রেকর্ড অনুযায়ী, আল-সাইয়েদের প্রতিদ্বন্দ্বী হ্যালি স্টিভেন্সকে প্রাথমিক বাছাইয়ে জেতাতে আইপ্যাক এবং অন্যান্য পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি (পিএসি) ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলারের বেশি খরচ করেছে। গত শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, আইপ্যাকের নির্বাচনী শাখা ‘ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট’ (ইউডিপি) এই নির্বাচনে ৩ কোটি ৬ লাখ ৩৮ হাজার ৬৩৯ দশমিক ৬৩ ডলার খরচ করেছে। এই নির্বাচনী চক্রে ইউডিপি যে ১০ কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছে, তার মধ্যে ৩ কোটি ডলার এসেছে সরাসরি আইপ্যাক থেকে।
আইপ্যাক ইউডিপি পরিচালনা করে এবং এই পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটির সবচেয়ে বড় দাতাও তারা। আইপ্যাক নিজেকে সচেতন আমেরিকানদের একটি জোট হিসেবে দাবি করলেও, তারা কথিত সামাজিক কল্যাণমূলক অলাভজনক সংস্থা হিসেবে কাজ করে, যার ফলে এর মূল দাতাদের চিহ্নিত করা কঠিন। মার্কিন নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে অলাভজনক সংস্থা থেকে পিএসিতে অর্থ স্থানান্তরের এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত বিতর্কিত। আইপ্যাক অতীতে ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে তাদের খরচ গোপন করতে এই ধরনের ‘শেল প্যাক’ ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই দৌড়ে আইপ্যাক–বহির্ভূত সবচেয়ে বড় দাতা হলো ‘এ স্ট্রংগার মিশিগান’ নামের একটি নতুন গোষ্ঠী, যা ১ কোটি ৭০ লাখ ডলারের বেশি খরচ করেছে। এই প্যাকের প্রধান অর্থ দাতা ‘সেন্টার ফরওয়ার্ড’ নামে একটি অলাভজনক সংস্থা, যাদের ঘোষিত লক্ষ্য হলো দ্বিদলীয় মনোভাব গড়ে তোলা। ‘এ স্ট্রংগার মিশিগান’ চলতি বছর প্রতিষ্ঠিত ‘মিশিগান ফরওয়ার্ড ২০২৬’ নামের আরেকটি প্যাক থেকেও তহবিল পেয়েছে। এফই রেকর্ড থেকে জানা যায়, মিশিগান ফরওয়ার্ড ২০২৬-কে অর্থায়ন করেছেন ব্যবসায়ী ড্যানিয়েল লুবেটজকি, কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির বাণিজ্য সংস্থা ‘আমেরিকান কেমিস্ট্রি কাউন্সিল’ এবং ‘আমেরিকান ফাউন্ডেশন ফর গুড গভর্ন্যান্স’ নামের আরেকটি অলাভজনক সংস্থা।
আলাদাভাবে, অলাভজনক সংস্থা সেন্টার ফরওয়ার্ডের সঙ্গে যুক্ত ‘সেন্টার ফরওয়ার্ড কমিটি’ নামের একটি প্যাক এই নির্বাচনে প্রায় ৯ লাখ ডলার খরচ করেছে। গোষ্ঠীটি শেভরন ও ইউনাইটেড হেলথ কেয়ারের মতো বড় কর্পোরেশনের সঙ্গে যুক্ত। শুধু তাই নয়, ‘ইউনাইট টু উইন’ নামের আরেকটি নতুন প্যাক স্টিভেন্সকে নির্বাচিত করতে প্রায় ৪০ লাখ ডলার নিয়ে মাঠে নেমেছে। সেই গোষ্ঠীটি ‘ডেমোক্রেসি ম্যাটার্স’ নামে একটি প্যাককে তাদের সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো ‘নিরপেক্ষ ব্যয়ের’ বাইরে গিয়ে সমর্থক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রার্থীকে সরাসরি অনুদান দিতে উৎসাহিত করার মাধ্যমে প্রচারে অর্থ পাঠাতে পারে।
আল-সাইয়েদ বলেন, ‘গত সপ্তাহেই আমাদের বন্ধু আপনাদের করের ৩৩০ কোটি ডলার একটি বিদেশি সরকারকে পাঠানোর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। আইপ্যাকের খরচ করা ৩ কোটি ডলারের বদলে এই সুবিধাই তারা পাচ্ছে।’ প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট আল-সাইয়েদ ‘নিরপেক্ষ ব্যয়’ হিসেবে প্রায় ৩৫ লাখ ডলার সমর্থন পেয়েছেন, যা স্টিভেন্সের পাওয়া পরিমাণের তুলনায় যৎসামান্য। সেই শিবিরের সবচেয়ে বড় দাতা হলো ‘ফাইটিং ফর মিশিগান’। এই প্যাক ‘ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিং, ইনক’ নামের একটি অলাভজনক সংস্থা থেকে অনুদান পেয়েছে। আল-সাইয়েদের শ্বশুর এই গোষ্ঠীতে ৩ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছেন।
গত জুনে ক্যালিফোর্নিয়ায় কংগ্রেসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ব্যর্থ হওয়া প্রগতিশীল সমর্থক সৈকত চক্রবর্তীও ‘ফাইটিং ফর মিশিগান’-কে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার দিয়েছেন। কিছু লেবার ইউনিয়ন এবং প্রগতিশীল ব্যক্তিরাও আল-সাইয়েদকে সমর্থন দিচ্ছেন। তবে স্টিভেন্সের বিশাল নির্বাচনী তহবিলের বিপরীতে এই অর্থ খুবই নগণ্য। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে স্টিভেন্স তাঁর পক্ষে আইপ্যাকের খরচ করা লাখ লাখ ডলারকে গুরুত্ব দেননি। তিনি বারবার এই গোষ্ঠীসংক্রান্ত প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন। অবশ্য অতীতে তিনি তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন।
সাম্প্রতিক এক বিতর্কে স্টিভেন্স বলেন, ‘আবদুল আল–সাইয়েদের জন্য সুপার প্যাক আসা আর আমার জন্য সুপার প্যাক আসার মধ্যে আমি তেমন কোনো তফাৎ দেখি না। আমাদের দেশে নির্বাচনী অর্থায়ন সংস্কার প্রয়োজন।’ স্টিভেন্সের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আল-সাইয়েদের সমর্থকেরা দ্রুতই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁরা উল্লেখ করেন, এই দুই প্রার্থীর তহবিলের পার্থক্যের পরিমাণ ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি। এই বিশাল বৈষম্যই মিশিগানের নির্বাচনী রাজনীতিতে আইপ্যাকের প্রভাবের মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ডিয়ারবোর্নে আল-সাইয়েদের সমর্থক ভিভিয়ান মোগনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘অগ্রগতি হচ্ছে। মিশিগান ১ কোটি ফিলিস্তিনি ও বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যার অঙ্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত।’ যদিও ২০১৬ ও ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে এই রাজ্যের ভোটাররা ভোট দিয়েছিলেন, তবুও বর্তমান ডেমোক্র্যাট প্রাইমারি নির্বাচনে ফিলিস্তিন ইস্যু ভোটারদের মধ্যে তীব্র মেরুকরণ তৈরি করেছে। কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব ও ইলহান ওমরসহ বেশ কয়েকজন আল-সাইয়েদের পক্ষে মঞ্চে উঠেছেন, যা এই লড়াইকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
প্রগতিশীল মহামারি বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা আল-সাইয়েদ অবসর নেওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের উত্তরসূরি হতে চার মেয়াদের কংগ্রেস সদস্য স্টিভেন্সের বিরুদ্ধে লড়ছেন। স্টিভেন্সের নাম খুব একটা আলোচনায় না থাকলেও, আইপ্যাকের বিশাল অর্থ তাকে এই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রেখেছে। আল-সাইয়েদের প্রচারণার মূল ভিত্তি হলো তৃণমূলের সমর্থন এবং ইসরায়েলি লবির বিরুদ্ধে অবস্থান। তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষের করের টাকা বিদেশি যুদ্ধের পেছনে ব্যয় না করে দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নে ব্যবহার করা উচিত।
নির্বাচনের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে মিশিগানের ভোটাররা এখন একটি বড় সিদ্ধান্তের মুখোমুখি। একদিকে রয়েছে আইপ্যাকের বিশাল অর্থবল এবং ইসরায়েলপন্থী নীতি, অন্যদিকে রয়েছে আল-সাইয়েদের প্রগতিশীল এজেন্ডা। এই লড়াই শুধু একটি আসনের জন্য নয়, বরং এটি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভবিষ্যৎ আদর্শিক লড়াইয়ের একটি কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মঙ্গলবার হতে যাওয়া এই নির্বাচনের ফলাফলই নির্ধারণ করবে মিশিগানের ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কোন পথে হাঁটবেন এবং আইপ্যাকের এই বিশাল বিনিয়োগের প্রভাব কতটুকু কার্যকর হবে।
তিনি পেয়েছেন ১ কোটি ৪৫ লাখ ডলার, যেখানে স্টিভেন্স পেয়েছেন ১ কোটি ১৯ লাখ ডলার।
গত শুক্রবার আল-সাইয়েদ বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে কোনো ব্যাধি নন; তিনি আমাদের রাজনীতির ব্যাধির প্রথম উপসর্গ মাত্র।
তিনি সিনেটের এই লড়াইয়ে আইপ্যাকের হস্তক্ষেপের সঙ্গে সেই নীতির যোগসূত্র তুলে ধরেন।
এই লড়াইয়ের বিজয়ী ব্যক্তি আগামী নভেম্বরে সম্ভাব্য রিপাবলিকান প্রার্থী, সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সের বিরুদ্ধে নির্বাচনে লড়বেন।
এখানে আল–জাজিরা এই প্রাথমিক বাছাই নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত প্রার্থীদের আর্থিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে।
এই অর্থ আইপ্যাকের জন্য একটি রেকর্ড, যারা ইসরায়েলকে শর্তহীন সহায়তা দেওয়ার বিরোধী প্রার্থীদের হারাতে তাদের বিপুল অর্থ খরচ করে আসছে।
আইপ্যাক ছাড়াও ইউডিপি মূলত ধনী ইসরায়েলপন্থীদের কাছ থেকে তহবিল পেয়ে থাকে।
ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের সমর্থন যখন সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে, ঠিক সেই সময়ে স্টিভেন্সের প্রতি আইপ্যাকের এই সমর্থন তাঁর বিরুদ্ধে আল-সাইয়েদের প্রচারের কেন্দ্রীয় একটি বিষয় হয়ে উঠেছে।
ব্যাধি হলো এই ব্যবস্থা—যা কোটিপতি, করপোরেশন এবং আইপ্যাকের মতো বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে আমাদের বিরুদ্ধে কলকাঠি নাড়তে রাজনীতিকদের কেনাবেচার সুযোগ দেয়।’
তালিকাভুক্ত করে বলেছে, ‘গর্বিত, ইসরায়েলপন্থী আমেরিকান হিসেবে আমরা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা এবং আমাদের মূল্যবোধকে যারা আঘাত করে, তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য কখনোই ক্ষমা চাইব না।’
ফিলিস্তিনি অধিকার–সমর্থকরা বলছেন, জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা আল-সাইয়েদ যদি স্টিভেন্স এবং আইপ্যাকের বিরুদ্ধে জয় ছিনিয়ে আনতে পারেন, তবে তা হবে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলপন্থী প্রচারের জন্য বড় এক ধাক্কা।
অনেক প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের বেশির ভাগ আসনে নির্বাচিত হলেও এই রাজ্যে আল-সাইয়েদের উত্থান ডেমোক্রেটিক দলের ভেতরে ইসরায়েল ইস্যুতে রাজনৈতিক ভূমিকম্পের সৃষ্টি করতে পারে।
সূত্র: প্রথম আলো



















