মতামত

ইরানের টিকে থাকার কৌশল: মতাদর্শের ঊর্ধ্বে যখন অস্তিত্ব রক্ষার রাজনীতি

  প্রতিনিধি 15 August 2026 , 2:26:11 প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পাঁচ মাসের বেশি সময় পার হলেও সংঘাত অবসানের কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তির দেখা মেলেনি। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁদের কোনো সরাসরি আলোচনা চলছে না। একদিকে তেহরানের পক্ষ থেকে প্রতিশোধের হুংকার শোনা যাচ্ছে, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের একাংশ দাবি করছেন, কঠোর মতাদর্শের কারণে ইরান কোনো সমঝোতায় আসতে সক্ষম নয়। তবে ইরানের সংবিধান ও রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কেবল অন্ধ মতাদর্শে চলে না। তাদের মূল লক্ষ্য হলো ‘হেফজে নেজাম’ বা শাসনব্যবস্থার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি করতেও দ্বিধা করে না। ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি ঘোষণা করেছিলেন যে, ইসলামি সরকারের অবস্থান নামাজ, রোজা বা হজের চেয়েও উঁচুতে। এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি অভ্যন্তরীণ বিতর্কের অবসান ঘটান এবং ১৯৮৯ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ১১২ অনুচ্ছেদে এই নীতি স্থায়ী রূপ পায়।

এই অনুচ্ছেদের আওতায় গঠিত হয় ‘এক্সপিডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিল’। এই পরিষদের মূল কাজ হলো শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে যেকোনো ধর্মীয় বিধান থেকে সরে আসার আইনি বৈধতা দেওয়া। অর্থাৎ, টিকে থাকাই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় দায়িত্ব। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানকে তারা নৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেও, প্রয়োজনে এই অবস্থান শিথিল করতে তারা পিছপা হয় না।

ইরানের ‘অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা’ নীতি লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনে তাদের প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী তত্ত্ব অনুযায়ী, যেকোনো রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য অস্তিত্ব রক্ষা। ইরানও সেই পথেই চলে। তারা নিজেদের সার্বভৌমত্বের কথা বললেও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে অন্য দেশের স্বাধীনতাকে নিরাপত্তার প্রয়োজনে গৌণ মনে করে।

ইতিহাস সাক্ষী, ইরান যখনই অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, তখনই আপস করেছে। ১৯৮৮ সালের জুলাই মাসে খোমেনি ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিকে ‘বিষপানের চেয়েও তিক্ত’ বলে মেনে নিয়েছিলেন। আবার ‘ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি’ বা ৯/১১ পরবর্তী আফগানিস্তানে তালেবান-পরবর্তী সরকার গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের গোপন সহযোগিতার নজির রয়েছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, তাদের কঠোর নীতির পেছনে একটি বিকল্প ‘অস্তিত্ব রক্ষার’ সুইচ আছে।

চলতি বছর এই কৌশল বড় পরীক্ষার মুখে পড়ে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর বিশেষজ্ঞ পরিষদ দ্রুত তাঁর ছেলে মোজতবাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেয়। যদিও বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মূল নীতির পরিপন্থী, তবুও শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে এই নিয়ম উপেক্ষা করা হয়েছে।

গত ১৭ জুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে সই করেন। এতে যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অর্থ ছাড়ের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। মোজতবা খামেনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও এতে অনুমোদন দেন। যদিও এই সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনতে পারেনি, তবে এটি প্রমাণ করে যে চরম সংকটে ইরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি চুক্তিতে পৌঁছাতে সম্মত।

২০১৩ সালে আলী খামেনি ‘বীরোচিত নমনীয়তা’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছিলেন। এটি অনেকটা কুস্তিগিরের কৌশলগতভাবে পেছনে হটার মতো। ইরান তাদের এই ছাড় দেওয়াকে ‘কৌশলগত ধৈর্য’ এবং পিছিয়ে যাওয়াকে ‘সংগ্রাম অব্যাহত রাখা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতেও একই কৌশল দেখা গিয়েছিল। ভবিষ্যতে কোনো সমঝোতা হলেও তাকে ‘ইসলামি ব্যবস্থার বেঁচে থাকার কৌশল’ হিসেবেই প্রচার করা হবে।

শত্রুর সঙ্গে চুক্তিতে যুদ্ধের ঝুঁকি কমলেও সাধারণ ইরানিদের জন্য তা কতটা সুফল বয়ে আনবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। যুদ্ধের অজুহাতে সরকার ইতিমধ্যে দেশে গ্রেপ্তার, বিচার ও মৃত্যুদণ্ড বাড়িয়ে দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে হয়তো অর্থনৈতিক কষ্ট কিছুটা কমবে, কিন্তু শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ দমননীতি কমবে না। বরং সরকারের হাতে দমন-পীড়ন জোরদার করার বাড়তি সম্পদ আসবে।

পরিশেষে, ইরান এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি তাদের শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখবে, কিন্তু ইরানিদের গণতন্ত্র উপহার দেবে না। বহিরাগত আক্রমণ থেকে ইরান রক্ষা পেলেও জনগণের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমবে না।

যারা এখনো প্রশ্ন করছেন যে ইরান কি নিজের টিকে থাকার জন্য চিরশত্রুতার নীতি বিসর্জন দেবে কি না, তাদের ১৯৮৯ সালে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ১১২ অনুচ্ছেদটি পুনরায় পড়ে দেখা প্রয়োজন। উত্তর সেখানেই নিহিত রয়েছে। হোসেন দাব্বাগ, যিনি যুক্তরাজ্যের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি লন্ডনের দর্শনের সহযোগী অধ্যাপক, আল-জাজিরায় প্রকাশিত তাঁর এই বিশ্লেষণটি বর্তমান ভূ-রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content