মতামত

নতুন সরকারের ছয় মাস: আইন ও সংস্কারের পথে রাষ্ট্র কোন দিকে এগোচ্ছে?

  প্রতিনিধি 20 August 2026 , 5:55:04 প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের রেশ ও প্রভাব রাষ্ট্রীয় কাঠামো, অর্থনীতি এবং রাজনীতির প্রতিটি স্তরে এখনো বিদ্যমান। এই বাস্তবতায় একটি নবনির্বাচিত সরকারকে বিচার করার জন্য ছয় মাস সময়কাল খুব বেশি না হলেও, এই সময়ে প্রণীত বিভিন্ন আইন ও আইনের খসড়াগুলো সরকারের মূল দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক অভিমুখ স্পষ্ট করে তুলেছে। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে সরকার কোন পথে এগোচ্ছে এবং নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ধারণে তাদের মনোভাব কেমন, তা এই খসড়া আইনগুলো থেকেই আঁচ করা সম্ভব।

সাইবার সুরক্ষা আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনী নিয়ে জনমনে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে বহুল বিতর্কিত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলন হয়েছিল। ২০২৩ সালে তা সংশোধন করে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’ করা হয়। পরবর্তীতে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর সেটি বাতিল করে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করা হয় এবং চলতি বছরের এপ্রিলে সংসদে ‘সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬’ পাস করা হয়। বর্তমানে গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ধারা যুক্ত করে আইনটিকে আরও কঠোর করার প্রক্রিয়া চলছে, যেখানে গুজব ও অপতথ্য ছড়ানোর দায়ে ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে কঠোর শাস্তি দিয়ে গুজব রোধ করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে যেমন সংশয় রয়েছে, তেমনি অপতথ্যের অজুহাতে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণের ঝুঁকিও প্রবল। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, সরকার সমস্যা সমাধানের পথ হিসেবে কেবল ‘শাস্তির মাত্রা বৃদ্ধি’কেই বেছে নিচ্ছে। অথচ আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে কঠোর আইন ব্যবহারের মাধ্যমে বিরোধী মত দমন ও নাগরিক অধিকার খর্ব করার অসংখ্য নজির রয়েছে।

গুমের মতো স্পর্শকাতর বিষয়েও সরকারের অবস্থান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিগত দেড় দশকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পদ্ধতিগতভাবে গুমের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ ‘গুম হইতে সকল ব্যক্তিকে সুরক্ষার নিমিত্ত আন্তর্জাতিক কনভেশন’-এ অনুস্বাক্ষর করে, যা মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল। এরপর ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারি করা হয়। সেখানে গুমের স্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণের পাশাপাশি নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ ও ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়েরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু সংসদে এই অধ্যাদেশটি রহিত করে নতুন একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। সেখানে গুমের তদন্তের ভার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিবর্তে খোদ পুলিশ বা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। যে বাহিনীর বিরুদ্ধে পদ্ধতিগতভাবে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, তারা কীভাবে নিজেদের সহকর্মীদের অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

একইভাবে, ‘মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫’ রহিত করে নতুন খসড়া তৈরি করা হয়েছে, যেখানে কমিশনকে কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে ফেলার আয়োজন রয়েছে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশন গঠন ও কমিশনার নিয়োগে একটি নিরপেক্ষ ভারসাম্য রাখা হয়েছিল। অথচ নতুন খসড়ায় নির্বাচন কমিটির ৯ সদস্যের মধ্যে স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভা সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সরকারের একক প্রাধান্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনকে সরকার বা বাহিনীপ্রধানের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে।

এই চারটি আইন ও প্রস্তাবিত খসড়া থেকে সরকারের রাজনৈতিক অভিমুখটি স্পষ্ট। একদিকে শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে অপরাধ দমনের চিন্তা ও নাগরিক অধিকার সীমিত করার হাতিয়ার তৈরি করা হচ্ছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি এড়ানোর পথ সুগম করা হচ্ছে। সুশাসনের জন্য নাগরিকদের এখনো সরকারপ্রধানের ‘সদিচ্ছা’র ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত সরকার যদি অধিকার হরণ করতে উদ্যত হয়, তবে নাগরিক কীভাবে আইনি সুরক্ষা পাবেন, তা গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন। এই কাঠামোগত নিশ্চয়তা নিশ্চিত না করলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর কখনোই টেকসই হবে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নতুন সরকারের ছয় মাসে কী পেল নাগরিক সমাজ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই বিধানের অসংগতি, অসামঞ্জস্য এবং বিচারব্যবস্থার মৌলিক ধারণার সঙ্গে এর সাংঘর্ষিকতা নিয়ে ইতিমধ্যে আইন বিশ্লেষকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এখানে অপরাধের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রাকে যেমন এক করে ফেলা হয়েছে, তেমনি আইনটির চরম অপব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় অতীতের প্রায়োগিক ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে একেবারেই বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সম্প্রতি এই আইনে আবার সংশোধনী আনার গুঞ্জন শুরু হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংস্কারের চেতনা থেকে সরকার অনেকটা সরে এসেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিএনপি সরকার ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশে এর একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ইতিহাস রয়েছে।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content