প্রতিনিধি 30 August 2026 , 5:14:15 প্রিন্ট সংস্করণ

মক্কা কেবল একটি শহর নয়, বরং মুসলমানদের কাছে এর গভীর ধর্মীয় ও প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান যখন ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা মক্কা চুক্তি স্বাক্ষর করে, তখন তা কেবল একটি সামরিক সমঝোতার গণ্ডি পেরিয়ে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দেয়। এই চুক্তির মূল ভিত্তি হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই শর্তটি ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর কথা মনে করিয়ে দেয়, যার ফলে অনেকে একে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তবে এই তুলনাটি পুরোপুরি নির্ভুল নয়, কারণ ন্যাটোর মতো বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো মক্কা চুক্তিতে এখনো দৃশ্যমান নয়।

এই চুক্তির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশগুলোর সামর্থ্য একে অপরের পরিপূরক। সৌদি আরবের রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি ও জ্বালানি সম্পদ, তুরস্কের রয়েছে ন্যাটো-অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী ও উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প, আর পাকিস্তানের রয়েছে বড় সামরিক সক্ষমতা। চুক্তিটি এমন এক সময়ে স্বাক্ষরিত হলো যখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নতুন মেরুকরণের দিকে ঝুঁকছে। ইরান-ইসরায়েল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও লোহিত সাগরের সংঘাতের মতো বিষয়গুলো এই জোটের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।
চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তুরস্ক জানিয়েছে, এটি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে করা হয়নি এবং এটি মূলত প্রতিরক্ষামূলক। তবে সামরিক জোট কখনোই ভূরাজনৈতিক শূন্যতায় জন্ম নেয় না। একে সরাসরি ইরান বা ইসরায়েলবিরোধী না বলে একটি নতুন ‘রিজিওনাল ব্যালান্সিং মেকানিজম’ বা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষার কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণের সময় নিয়ে এসেছে। গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, চুক্তিটি তিনটি দেশের মধ্যে হয়েছে এবং বাংলাদেশ একে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। তিনি আরও বলেন, ‘এ প্যাক্ট তিনটি দেশের মধ্যে হয়েছে। এ প্যাক্টটিকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। এতে যোগদান বা যোগদান না করার বিষয়টি এখনো আসেনি, কারণ এটা নির্ভর করছে প্যাক্টের সদস্যদের অভিপ্রায়ের ওপর।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও যোগ করেন, ‘তার আগে এর ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা করাটা, সম্ভবত সে সময় আসেনি। আমরা নিশ্চয়ই এসব বিষয় বিবেচনা করব। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, এ প্যাক্ট যদি বিস্তৃত হয়, এটি বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা।’
মক্কা চুক্তিতে যোগদানের পক্ষে বেশ কিছু জোরালো যুক্তি রয়েছে। সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। তুরস্ক প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা। এছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ ও বিনিময় জোরদার করার সুযোগ রয়েছে। মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা ও রোহিঙ্গা সংকটের মতো নিজস্ব নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই ধরনের অংশীদারত্ব বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা, ড্রোন প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
তবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আর যৌথ প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশ তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে পারে, কিন্তু পূর্ণ সদস্যপদ গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত সম্পর্কের কারণে নয়াদিল্লি এই জোটকে পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রভাব হিসেবে দেখতে পারে। যদিও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীন, তবুও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা জরুরি।
ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের মৌলিক কোনো বিরোধ নেই। ভবিষ্যতে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সংঘাত হলে এই চুক্তির ‘কালেকটিভ ডিফেন্স ক্লজ’ বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে, তা একটি বড় প্রশ্ন। এছাড়া চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে, আবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার। কোনো সামরিক জোটে যোগ দিয়ে এই ভারসাম্য নষ্ট করা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বড় শক্তি হলো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গে একই সময়ে কাজ করার ক্ষমতা। কোনো সামরিক জোটে প্রবেশ করে সেই নমনীয়তা সংকুচিত করা উচিত হবে না। তাই ‘যোগ দেব’ বা ‘যোগ দেব না’—এই দুই চরমপন্থার বাইরে গিয়ে বাংলাদেশকে চুক্তিটির আইনি ও সামরিক কাঠামো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতে হবে।
শুরুতেই পূর্ণ সদস্য না হয়ে বাংলাদেশ পর্যবেক্ষক বা সংলাপের অংশীদার হিসেবে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিতে পারে। যৌথ প্রশিক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোতে সহযোগিতা করা যেতে পারে। যদি পূর্ণ সদস্য হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে তার আগে ‘প্রিভেন্টিভ ডিপ্লোমেসি’ বা প্রতিরোধমূলক কূটনীতির মাধ্যমে ভারত, ইরান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো অংশীদারদের কাছে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।
পরিশেষে, বাংলাদেশের মূল নীতি হওয়া উচিত—বন্ধু বাড়াতে হবে, কিন্তু বন্ধুদের শত্রু আমদানি করা যাবে না। মক্কা চুক্তির ধর্মীয় আবেদনের চেয়ে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা চুক্তির ‘ছোট ছোট অক্ষরে’ লেখা বাধ্যবাধকতাগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কখন, কোথায় এবং কার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে হবে—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বাংলাদেশের নিজের হাতেই থাকা উচিত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ন্যাটো শুধু একটি ‘কালেকটিভ ডিফেন্স ক্লজ’ (আন্তর্জাতিক চুক্তির এমন একটি বিশেষ নিয়ম, যেখানে বলা থাকে যে—চুক্তিবদ্ধ কোনো একটি দেশের ওপর বাইরের শত্রু আক্রমণ করলে তা সবার ওপর আক্রমণ বলে গণ্য হবে এবং সব সদস্যদেশ মিলে সেই শত্রুর বিরুদ্ধে একসঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে)। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিভাগের হওয়া সত্ত্বেও কোনো যৌথ অভিযান চালাতে পারে), ‘ইনস্টিটিউশনালাইজড ডিসিশন-মেকিং’ (নির্দিষ্ট নিয়ম, সুপ্রতিষ্ঠিত কাঠামো, তথ্য-প্রমাণ এবং পূর্বনির্ধারিত নীতিমালার ভিত্তিতে প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত) এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে সুস্পষ্ট। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য থেকে এমন বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে না; বরং এর ‘অপারেশনাল আর্কিটেকচার’ (প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেমের এমন একটি কাঠামোগত নকশা, যা নির্ধারণ করে কীভাবে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাই মক্কা চুক্তিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলা যেমন তাড়াহুড়া হবে, তেমনি এটিকে নিছক প্রতীকী ঘোষণা মনে করাও ভুল হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দীর্ঘদিন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাকাঠামো ব্যাপকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ওপরের প্রশ্নটির আনুষ্ঠানিক উত্তর, কোনোটিই নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইরানের সামরিক প্রভাব, ইসরায়েলের আঞ্চলিক সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব, উপসাগরীয় অঞ্চলের অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুই এর পেছনের কৌশলগত প্রেক্ষাপট।
সূত্র: প্রথম আলো



















