মতামত

কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ: সমাজ ও রাজনীতির বৈপরীত্য

  প্রতিনিধি 7 August 2026 , 5:46:36 প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের সমাজে প্রবাদবাক্যের ছড়াছড়ি। প্রতিটি প্রবচনের উৎস হচ্ছে সমাজের কোনো না কোনো অসংগতি, উৎসব, সমস্যা কিংবা সমাধান। বাংলা বর্ষপঞ্জির নবম মাস পৌষ, যখন নতুন ধান ঘরে আসে এবং পিঠাপুলি ও খেজুরের রসের উৎসব হয়। গৃহস্থের কাছে এটি খুশির সময় হলেও, দিনমজুর বা গরিব মানুষের কাছে এই মাস মানেই দুর্দশা। তীব্র শীতে খাবার ও কাপড়ের অভাব তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।

একই সময়ে একজনের জন্য আনন্দ ও সমৃদ্ধি আসে, আরেকজনের জন্য তা হয়ে ওঠে দুঃখ ও ধ্বংসের কারণ। এটি বাংলার কৃষিজীবী সমাজ থেকে উদ্ভূত একটি প্রবাদ, যা আমাদের সমাজের বৈষম্যের চিত্রটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। অর্থাৎ, একের লাভ মানেই অন্যের ক্ষতি। এ পটভূমিতেই তৈরি হয়েছে প্রবাদবাক্য—কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ।

আমাদের দেশে সেতু মানেই উন্নয়ন। নতুন সেতু তৈরি হলে যাত্রীদের সুবিধা হয়, কিন্তু নৌকার মাঝি কাজ হারায়। আমাদের দেশে এ রকম অনেক পেশা হারিয়ে গেছে। এখন আর ঢেঁকি নেই, ঘানি নেই, বলদে টানা লাঙল নেই। এটাও এক ধরনের সর্বনাশ। তারপরও সমাজ থেমে থাকে না, বিকল্প তৈরি হয়ে যায়। শহরাঞ্চলে পোশাক তৈরির কারখানা যত তৈরি হচ্ছে, গ্রামের বিনা পারিশ্রমিকের গার্হস্থ্য নারী মজুরেরা শহরে এসে কারখানায় চাকরি নিচ্ছেন। এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যায়, যদিও গার্মেন্টস সেক্টরে শ্রম শোষণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এর উল্টো দিকও আছে। গ্রামে যে নারীর জীবন ছিল দাসত্বের, শহরের কারখানায় এসে সে স্বাধীনতার স্বাদ পায়। তার হাতে কিছু কাঁচা টাকা আসে, যা দিয়ে সে নিজের পছন্দের জিনিস কিনতে পারে। ভোর হলেই দেখা যায় শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে নারী, হাতে ঝুলছে টিফিন ক্যারিয়ার বা খাবারের পুঁটুলি, ঋজু ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছে কর্মস্থলের দিকে। ৫০ বছর আগেও এ দৃশ্য দেখা যেত না। তারা বাঁধা পড়ে ছিল সনাতন গার্হস্থ্য জীবনে।

একজন আদর্শ কৃষকের জীবনে একখণ্ড জমি, এক জোড়া হালের বলদ আর একজন স্ত্রী ছিল। স্বামী-সন্তানের সেবা করাই ছিল তার নিয়তি। সে যে একজন মানুষ, এটি প্রথম সে আবিষ্কার করে কারখানায় এসে। ইউরোপে একেই বলা হয়েছে শিল্পবিপ্লব, যেখানে হাজার বছরের গ্রামীণ সমাজকাঠামো ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। মানুষ ভূস্বামীর দাসত্ব থেকে পালিয়ে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছিল। ৩০০ বছরের ব্যবধানে তারা এমন একটা সমাজ তৈরি করেছে, যেখানে বিলিয়নিয়ার থাকলেও ভিক্ষুক নেই। আমাদের দেশে গৃহকর্মীর দাম এত চড়া যে অনেককে গার্মেন্টস সেক্টরকে গালাগাল করতে দেখি, যারা মনে করে এই কারখানাগুলোর কারণে এখন সস্তায় গৃহকর্মী পাওয়া যায় না।

জীবনের বৈপরীত্য এমনই। একজন ব্যবসায়ী নতুন প্রযুক্তি এনে বাজার দখল করলে তার লাভের অঙ্ক বাড়ে, কিন্তু ছোট দোকানদার ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। শহরে নতুন বাস এলে যাত্রীদের সুবিধা হয়, রিকশা-টেম্পোওয়ালা কাজ হারায়। যুদ্ধের ময়দানে বিজয়ীর পতাকা ওড়ে, কিন্তু পরাজিতের ঘরে শোকের ছায়া নেমে আসে।

দেশে যখন রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে, তখন তার ঝাপটায় চারদিক তছনছ হয়ে যায়। রাজনৈতিক ঝড়ঝাপটা মানে শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর হতাশা। একদল মানুষের কাছে এটি মুক্তির বার্তা, অন্যদের কাছে ভয় আর ক্ষতির প্রতীক। ঝড়ের পর যেমন গাছ ভেঙে পড়ে, আবার নতুন কুঁড়িও জন্ম নেয়—তেমনি রাজনৈতিক ঝড় সমাজকে ভেঙে আবার গড়ে তোলে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একদল জমি হারিয়েছিল। তাদের ফেলে যাওয়া জমিটি ফলবাগানে ভরে ওঠেনি। বছরের পর বছর জমে থাকা হিংসা, বিদ্বেষ ও দলান্ধতা এখনো থিকথিক করছে। একটা দল পালিয়েছে, লুকিয়েছে, ধরা পড়ে পিটুনি খাচ্ছে, আর আরেকটা দল তাদের দখলে থাকা সবকিছুতে হানা দিচ্ছে। বাগান, ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়ের পদ, টিভি চ্যানেল, মসজিদের দানবাক্স, সরকারি সংস্থার চেয়ার—সবই দখলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।

আমার এক বন্ধু, যে একসময় ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিল এবং সততার সাথে ব্যবসা করে, সে এখন চাঁদাবাজির শিকার। তার কাছে একটি কার্ড পাঠানো হয়েছে, যেখানে কোনো পেশার উল্লেখ নেই, আছে একটি দলের জেলা কমিটির ৪৪ নম্বর সদস্য পরিচয়। বন্ধুটি চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তাকে নানাভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে। সে আক্ষেপ করে বলে, এ কেমন দেশে বাস করছি আমরা? আমার শ্রম আর পুঁজি দিয়ে ব্যবসা করব, তার জন্য চাঁদা দিতে হবে? সে এদের ‘বায়োলজিক্যাল ওয়েস্ট’ বা সমাজের বর্জ্য বলে অভিহিত করে। তার মতে, আমাদের দরকার একজন নিষ্ঠুর কিন্তু সৎ শাসক, যে এই জঞ্জাল ধ্বংস করবে। এই আক্ষেপ আমাদের টেমস নদীর পাড় থেকে শেখা ওয়েস্টমিনস্টার ডেমোক্রেসির ধারণাকে এক বড় ধাক্কা দেয়।

চলাচলকারী পথচারী, নিতম্ব-প্রধান নারী

আমি অনেককে বলতে শুনেছি, গার্মেন্টস সেক্টরে শ্রম শোষণের মাত্রা খুব বেশি।

আমি বুঝতে পারি, এটা প্রমাণ করতে পারলে তার ভালো একটা থিসিস হয়।

বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খুশি হন।

ইতিহাসের পাতা খুললেই দেখা যায়, রাজনৈতিক ঝড়ঝাপটা কখনো স্বাধীনতার জন্ম দিয়েছে, কখনো আবার বিভেদের দেয়াল তুলেছে।

আন্দোলন, বিপ্লব, নির্বাচন—সবই এই ঝড়ের অংশ।

তবে ঝড়ের মতোই রাজনীতির ঝাপটা সাময়িক।

কিন্তু সেই স্থিতি কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করে মানুষের স্বভাব আর চেতনার ওপর।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ও নৃশংসতা দেখে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল।

লিখেছিলেন ‘সভ্যতার সংকট’ নামে একটি প্রবন্ধ, যার দুটি লাইন এ রকম: আজ মানবতার মহাসমুদ্রের মহাসংকটের দিনে আমাদের আশা, আমাদের বেদনা এক সুতোয় বাঁধা।

একটা বড় রকমের পালাবদল ঘটে গেলে কী হয়, তা আমরা আজ চোখের সামনে দেখছি।

এ প্রসঙ্গে রফিক আজাদের ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতার কটি লাইন উদ্ধৃত না করে পারছি না

দৃশ্য থেকে দ্রষ্টা অবধি ধারাবাহিকতা খেয়ে ফেলে

গ্রাম-গঞ্জ, ফুটপাত, নর্দমার জলের প্রপাত

উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ি

আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ।

সমাজের একটি অংশ অনেক দিন লুটে খেয়েছে।

ব্যবসা করলেও সংস্কৃতি বিসর্জন দেয়নি।

তার সততা নিয়ে কেউ কখনো প্রশ্ন তোলেনি।

বললাম, আপনি এলাকার কোনো নেতা-মন্ত্রীকে বলুন।

এই রাজনীতিটাই দাঁড়িয়ে আছে চাঁদাবাজির ওপর।

তারপর সে এমন একটা সমাধানের কথা বলল, শুনে আমার এত দিনের পূর্বধারণা ধাক্কা খেল।

বলল, আমাদের দরকার একজন ক্রুয়েল অনেস্ট ডিক্টেটর।

সে নিষ্ঠুর হবে, কিন্তু চোর, বদমাশ, লুটেরা হবে না।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content