প্রতিনিধি 16 September 2026 , 3:43:55 প্রিন্ট সংস্করণ

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড ও এর ফলে হতাহতের ঘটনাটি দেশের চিকিৎসাসেবা খাতের চরম অব্যবস্থাপনা ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতার একটি বড় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত সোমবার বিকেলে হাসপাতালটির নতুন বহুতল ভবনে আগুনের সূত্রপাত হলে রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে প্রচণ্ড আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভবন থেকে দ্রুত বের হওয়ার সময় হুড়োহুড়িতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে হাসপাতালের পাঁচটি জরুরি সিঁড়ির মধ্যে চারটিই তালাবদ্ধ রাখা হয়েছিল, যা এই সংকটের সময় বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এক সপ্তাহ ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকা একটি লিফটের শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের প্রায় ৩০ মিনিটের প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ঘটনার সময় আটতলা ভবন থেকে নামতে গিয়ে চারজন পদদলিত হয়ে মারা গেছেন বলে স্বজনরা অভিযোগ করেছেন। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা পদদলিত হয়ে মৃত্যুর বিষয়টি অস্বীকার করছেন, কিন্তু তিনটি ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেছেন যে তাদের স্বজনরা পদদলিত হওয়ার কারণেই প্রাণ হারিয়েছেন। এই বিতর্কিত মৃত্যুর বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি।
হাসপাতালের নতুন ভবনে ৫টি সিঁড়ি ও ১১টি লিফট থাকার কথা থাকলেও অগ্নিদুর্ঘটনার সময় অধিকাংশ সিঁড়ি বন্ধ থাকা বড় ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ। অগ্নিকাণ্ডের সময় লিফট বন্ধ থাকা স্বাভাবিক নিয়ম হলেও চারটি সিঁড়ি কেন তালাবদ্ধ ছিল, তার সদুত্তর মেলেনি। এই ঘটনায় শিশু ওয়ার্ড ও হৃদ্রোগ বিভাগসহ অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিভিন্ন ইউনিটের রোগীদের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। নিছক ভাগ্যের জোরেই অনেক নারী ও শিশু সেদিন রক্ষা পেয়েছেন। দুর্ঘটনা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে তালাবদ্ধ সিঁড়িগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিন্তু এই তালা লাগানোর পেছনে দায়ীদের চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ময়মনসিংহ মেডিকেলের এই দুর্ঘটনা দেশের প্রতিটি হাসপাতালের জন্য একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে ধারণক্ষমতার চেয়ে অধিক রোগী এবং তাদের সঙ্গে থাকা স্বজনদের ভিড়ে হাসপাতালগুলো এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। বহুতল হাসপাতাল নির্মাণের নকশা থেকে শুরু করে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ভেন্টিলেটর, আইসিইউ বা সিসিইউতে থাকা মুমূর্ষু রোগী, নবজাতক বা গর্ভবতী নারীদের অগ্নিকাণ্ডের সময় সিঁড়ি দিয়ে নামানো প্রায় অসম্ভব। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী একই তলায় নিরাপদ ফায়ার কম্পার্টমেন্টে রোগীদের সরিয়ে নেওয়ার মতো ‘হরাইজন্টাল ইভাকুয়েশন’ পদ্ধতি এবং প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
পরিশেষে, শুধু একটি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা নয়, বরং সারা দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে বড় ধরনের পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সীমিত জমিতে বহুতল হাসপাতাল নির্মাণ বর্তমান সময়ের বাস্তবতা হলেও, সেই অনুযায়ী অগ্নিনিরাপত্তার আধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশল অবলম্বন না করা হলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হবে। প্রতিটি সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা জরুরি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আমরা মনে করি, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এ অভিযোগের নিষ্পত্তি করতে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এরপর প্রত্যেক রোগীর সঙ্গেই একাধিক স্বজন থাকেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা থাকেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সব মিলিয়ে এ ধরনের একটা জনাকীর্ণ ও সংবেদনশীল স্থাপনা নির্মাণের সময়ই অগ্নিনিরাপত্তাসহ অন্যান্য নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই নকশা করতে হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আতঙ্কিত রোগী ও স্বজনেরা একটা সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করায় ভোগান্তি ও হতাহতের ঘটনা বেড়ে যায়।
সূত্র: প্রথম আলো



















