সারাদেশ

ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি: তীব্র প্রতিবাদ ও তদন্ত কমিটি

  প্রতিনিধি 15 September 2026 , 12:48:45 প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি স্থাপন করা নিয়ে ক্যাম্পাসে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গত রোববার এই সংগ্রহশালাটি সংস্কারের পর পুনরায় চালু করা হয়। এরপরই সংগ্রহশালায় জিন্নাহর তিনটি ছবি এবং ছাত্রসংঘের সাবেক নেতা আবদুল মালেকের ছবি স্থান পাওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এই ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। সোমবার সংগ্রহশালায় থাকা জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী ও সাবেক ভিপি পদপ্রার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার। তিনি জানান, যে ব্যক্তি বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাঁর ছবি ডাকসুর মতো জায়গায় থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদে অন্যান্য ছাত্রসংগঠনগুলোও কর্মসূচি পালন করেছে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ছবিগুলো অপসারণের দাবি জানিয়েছে। ছাত্রদলের দাবি, ভাষা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিকভাবে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন অভিযোগ করেছে, সংগ্রহশালা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সরিয়ে ফেলা ইতিহাস বিকৃতির শামিল। তারা অবিলম্বে জিন্নাহর ছবি সরিয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবি পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে। প্রতিবাদস্বরূপ ছাত্র ফেডারেশনের নেতা অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী জিন্নাহর ছবির ওপর ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমে গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার ছবি টানিয়ে দিয়েছেন।

তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদের মুখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম জানিয়েছেন, ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ ও আবদুল মালেকের ছবি রাখার বিষয়টি আগে থেকে তাঁদের জানা ছিল না। এই ঘটনা তদন্তের জন্য সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ডাকসু যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছে তার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপাচার্যের নির্দেশনা বা অনুমতি নেওয়া হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে কলাভবনের পাশে ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে অনুমতি ছাড়া ‘নির্ভীক জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন এবং শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য অনুমোদনহীন ওয়েবসাইট চালু। প্রশাসন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ ও আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক এবং তা গ্রহণযোগ্য নয়।

ঘটনার বিষয়ে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ সাংবাদিকদের বলেন, জিন্নাহর ছবির নিচে তাঁর বাংলা ভাষাবিরোধী অবস্থানের বক্তব্যগুলোও উল্লেখ করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, ছবি প্রদর্শন করা হয়েছিল ইতিহাসের অংশ হিসেবে, যেন জিন্নাহর ভাষাবিরোধী অবস্থান গোপন না থাকে। তবে এই ব্যাখ্যায় শান্ত হননি সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গত সোমবার বিকেলে ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-বিসিএল যৌথ বিক্ষোভ সমাবেশ করে। এছাড়া রাত আটটায় মল চত্বরের ‘জুলাই নির্ভীক’ স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতারা এক সংবাদ সম্মেলনে ছবি স্থাপনের ঘটনার প্রতিবাদ জানান। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উপমহাদেশ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার বিরল আলোকচিত্র, পেপার কাটিং এবং গুরুত্বপূর্ণ দলিল ডাকসু সংগ্রহশালায় রক্ষিত আছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর মধ্যে একটি ছবি ১৯৪৮ সালে ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক অনুষ্ঠানের, যেখানে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আরও স্থান পায় ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি দলগত ছবি ও ডন পত্রিকার প্রতিবেদনের পেপার কাটিং। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ কারণে তিনি জিন্নাহর প্রতি আলাদা দরদ থেকে এমনটি করে থাকতে পারেন।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনে তিনি সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আবু তৈয়ব সাংবাদিকদের বলেন, ‘যে জিন্নাহ আমাদের মাতৃভাষার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, যে জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ছাত্রছাত্রীদের গ্রেপ্তার করেছিল, সেই জিন্নাহ ডাকসুতে স্থান পেতে পারে না।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ছবিটি অপসারণ এবং ডাকসুকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আদর্শ প্রচারের স্থান হিসেবে ব্যবহার বন্ধের দাবি জানিয়েছে ছাত্রদল।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content