আন্তর্জাতিক

ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার মাঝে চীন-কাতার সম্পর্ক কেন আরও গভীর হচ্ছে?

  প্রতিনিধি 10 September 2026 , 11:12:03 প্রিন্ট সংস্করণ

ইরানকে ঘিরে চলমান আঞ্চলিক যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অস্থিরতার মধ্যেই চীন সফর করেছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি। গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ও মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই দুই দিনের সফরকে বেইজিং ও দোহা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক যোগাযোগ হিসেবে দেখছে। চীনা কর্মকর্তাদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক এখন নতুন এক ‘স্বর্ণযুগে’ প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিডিয়া ও যোগাযোগ পরিচালক ইব্রাহিম বিন সুলতান আল-হাশমি মঙ্গলবার দোহায় সাংবাদিকদের বলেন, যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি জানান, কাতার তার অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে এই সংকট নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চীনও দোহাকে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা চীন ও কাতার—উভয়ের জন্যই বড় উদ্বেগের কারণ। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। কাতার বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এলএনজি রপ্তানিকারক এবং চীন বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিকারক দেশ। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ পথে দীর্ঘস্থায়ী সংকট দুই দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কাতার চীনকে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখার নিশ্চয়তা দিয়েছে।

জ্বালানি খাতই মূলত চীন-কাতার সম্পর্কের মূল ভিত্তি। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩.৮ বিলিয়ন বা ২৩৮০ কোটি ডলার। ২০২৫ সালে কাতার চীনকে ১ কোটি ৯৪ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করেছে, যা দেশটিকে চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারীতে পরিণত করেছে। এছাড়া কাতারএনার্জি চীনের সিএনপিসি ও সিনোপেকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী ২৭ বছরের এলএনজি সরবরাহ চুক্তি করেছে এবং চীনের এই কোম্পানিগুলো কাতারের নর্থ ফিল্ড গ্যাস প্রকল্পে অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।

ইরান ইস্যুতে দুই দেশের কৌশলগত অবস্থানে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও কূটনৈতিক লক্ষ্য অভিন্ন। চীন ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিরোধী এবং তেহরানের সঙ্গে তাদের শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সামরিক শক্তির পরিবর্তে সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। অন্যদিকে, কাতার প্রকাশ্যে তেহরানের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানালেও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সংলাপের পথ খোলা রাখতে কাজ করছে।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক অংশীদারত্ব রয়েছে, বিশেষ করে কাতারে অবস্থিত আল উদেইদ সামরিক ঘাঁটিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত ৩ মার্চ ইরান থেকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আল উদেইদ ঘাঁটির কাছে আঘাত হানে, যার ফলে দোহা ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। তবে চীন যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা নিয়ে কাতারের নিরাপত্তার প্রধান নিশ্চয়তাদাতা হতে আগ্রহী নয়; বরং তারা একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছে।

সফরে শুধু ইরান সংকট নয়, বরং দুই দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অর্থ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কাতারের প্রধানমন্ত্রীও উচ্চপ্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।

বর্তমানে কাতারে ৫২০টি চীনা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইনভেস্ট কাতারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে এসব কোম্পানির বিনিয়োগ প্রকল্পের মূল্য ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং এর মাধ্যমে ৩ হাজার ২০০টির বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলিয়ে, বর্তমান আঞ্চলিক সংকট চীন ও কাতারের সম্পর্ককে শুধু জ্বালানি বা বাণিজ্যের গণ্ডিতে আটকে না রেখে কূটনীতি ও প্রযুক্তির নতুন দিগন্তে প্রসারিত করছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তার ভাষায়, এই অবস্থা অঞ্চল, আঞ্চলিক দেশ ও সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনছে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে ও নতুন নতুন ধারণা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হরমুজ প্রণালির অস্থিরতায় কেন ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইরান প্রশ্নে একই স্বার্থ, ভিন্ন কৌশল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চীন বারবার কাতারের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলা কিংবা জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার ঘটনায় বেইজিং সরাসরি তেহরানের সমালোচনা থেকে অনেকটাই বিরত থেকেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বরং চীনের কর্মকর্তারা সংঘাতের জন্য মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে আসছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চীনা কূটনীতিকদের ভাষায়, এই সংঘাত ‘কখনোই হওয়া উচিত ছিল না’।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content