আন্তর্জাতিক

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্কের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা চুক্তি

  প্রতিনিধি 20 September 2026 , 1:58:33 প্রিন্ট সংস্করণ

গ্রিনল্যান্ডের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে পোষণ করে আসছিলেন, তার চেয়ে অনেক কম অর্জনে শেষ হয়েছে দুই দেশের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন। অবশেষে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত এই ভূখণ্ডে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে একটি নিরাপত্তা চুক্তিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র। চুক্তির বিস্তারিত শর্তাবলি এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা না হলেও, এটি নিশ্চিত যে ট্রাম্পের আগের দাবিগুলো বাস্তব রূপ পায়নি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করে নেওয়ার বিষয়ে জোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এমনকি তার ঘনিষ্ঠ মহলের পক্ষ থেকে দ্বীপটি কিনে নেওয়ার বা প্রয়োজনে বল প্রয়োগের ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছিল। এসব কঠোর অবস্থানের ফলে ন্যাটোর সহযোগী দেশ ডেনমার্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে বড় ধরনের অস্বস্তি ও টানাপোড়েন তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত করতে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

চুক্তি স্বাক্ষরের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রাম্প দাবি করেন, এর মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও সব ধরনের চাহিদার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হলো। তিনি এটিকে আজীবন মেয়াদি বা ‘ইনফিনিট লাইফ’ চুক্তি বলে অভিহিত করেছেন। ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, এই চুক্তির ফলে গ্রিনল্যান্ডে কোনো মার্কিন প্রতিপক্ষ দেশের সামরিক ঘাঁটি স্থাপন, উপস্থিতি বজায় রাখা বা কোনো অর্থনৈতিক বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে না। তবে নিজের এই ‘মনস্তাত্ত্বিক’ বিজয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আগ্রহই যে বেশি, তা তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল। তিনি স্বীকার করেন যে, মালিকানা না হলেও এই চুক্তি তাঁর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা পূরণের একটি ধাপ।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন নতুন এই চুক্তিকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, চুক্তিতে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে পূর্ণ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডেরিকসেনের মতে, এই সমঝোতা আর্কটিক অঞ্চল ও উত্তর আটলান্টিকে ন্যাটো ও ইউরোপের নিরাপত্তার শক্তি বাড়াবে।

গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব সম্পর্কে ট্রাম্প বারবার উল্লেখ করেছেন যে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। গত জুলাই মাসে ন্যাটো সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, পুরো বিশ্বের সুরক্ষায় এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। মূলত রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে এবং আটলান্টিক ও সুমেরু অঞ্চলের সংযোগকারী নৌপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতেই ওয়াশিংটন মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলে নতুন নৌপথ খুলে যাওয়ায় ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপট বদলে গেছে।

এর পাশাপাশি খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরেও পরাশক্তিদের প্রতিযোগিতা রয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও আধুনিক প্রযুক্তিপণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় দুর্লভ খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে চীনের যে একক আধিপত্য, তা ভেঙে দিতে এই দ্বীপের খনিজ সম্পদের ওপর নজর যুক্তরাষ্ট্রের। গত ৯ জানুয়ারি ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, তারা উদ্যোগ না নিলে রাশিয়া বা চীন গ্রিনল্যান্ড দখল করে নিতে পারে।

উল্লেখ্য, ৩০০ বছরের বেশি সময় ধরে ডেনমার্কের অধীনে থাকা গ্রিনল্যান্ড ১৯৭৯ সালে স্বায়ত্তশাসন লাভ করে। ২০০৯ সাল থেকে দ্বীপটির অধিবাসীদের স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোটের অধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিষয়ে ডেনমার্ক এখনো কর্তৃত্ব বজায় রাখে। এছাড়া শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও জ্বালানি খাতের জন্য দ্বীপটি ডেনমার্কের বার্ষিক অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। জরিপে দেখা গেছে, স্থানীয় অধিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতে আগ্রহী নন।

উল্লেখ্য যে, ১৯৫১ সালের বিদ্যমান একটি চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই গ্রিনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রেখে আসছে। সে সময়কার চুক্তিতে মার্কিন কর্মীদের আবাসন সুবিধা, নৌযান ও উড়োজাহাজের চলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকার যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া হয়েছিল। নতুন নিরাপত্তা চুক্তিটি সেই সামরিক উপস্থিতি ও প্রভাবের ক্ষেত্রকে আরও কতটুকু প্রশস্ত করে, তা এখন দেখার বিষয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ একজন তো বলেই বসেছিলেন, ট্রাম্প দ্বীপটি কিনে নিতে চান, আর অন্য এক কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করেই তা দখলে নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের নেতারা অবশ্য শুরুতেই এই প্রস্তাব নাকচ করে দেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এদিকে ন্যাটোর এক সহযোগীর ভূখণ্ড ছিনিয়ে নেওয়ার এমন হুমকিতে ইউরোপীয় নেতারা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, তা নিয়ে বেশ অস্বস্তিতে পড়েন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শেষ পর্যন্ত এ নিয়ে জল ঘোলা হলে জটিল ওই সংকট কাটাতে ওয়াশিংটনে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসেন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের প্রতিনিধিরা। চাকরির আরও তথ্য: রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের পাশ কাটিয়ে চলতেই গ্রিনল্যান্ডের যেকোনো বড় বিনিয়োগ চুক্তিতে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা বা ‘একচ্ছত্র অধিকার’ নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন মার্কিন আলোচকেরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক এই প্রস্তাবে তীব্র আপত্তি জানান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চুক্তিটিতে কীভাবে এ সংকটের সমাধান করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content