আইন-আদালত

গোয়েন্দা তথ্যের অভাবে হাতছাড়া পাচার হওয়া ৩০৭ কোটি টাকা

  প্রতিনিধি 20 September 2026 , 2:29:44 প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া ২৫ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩০৭ কোটি টাকা উদ্ধারের বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে কার্যকর আইনি পদক্ষেপের অভাবে। যুক্তরাজ্যের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) এই বিপুল অর্থের সন্ধান পাওয়ার পর বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) অবহিত করেছিল। তবে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথিপত্র সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় লন্ডন থেকে এই অর্থ কৌশলে দুবাইয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তদন্ত নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনস্থ বিএফআইইউ এই অর্থ উদ্ধারে সময়মতো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। ঘটনাটি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির। ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর ইউবিএস এজির লন্ডন শাখার একটি ব্যাংক হিসাবে ২৫ মিলিয়ন ডলার থাকার তথ্য বাংলাদেশকে জানায় এনসিএ। তখন ঢাকা থেকে শওকত আলীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগের তদন্ত চলছিল।

যুক্তরাজ্যের আদালতের মাধ্যমে অর্থ আটকে রাখার জন্য বিএফআইইউ’র কাছে বেশ কিছু মৌলিক আইনি ভিত্তি ও তথ্য চেয়েছিল এনসিএ। তাদের মূল প্রশ্ন ছিল—পাচার হওয়া অর্থের সঙ্গে বাংলাদেশে কোনো অপরাধের সরাসরি যোগসূত্র আছে কি না এবং শওকত আলীর কোনো সম্পদ বাংলাদেশে ইতোমধ্যে জব্দ বা ক্রোক করা হয়েছে কি না। কিন্তু বিএফআইইউ কার্যকর কোনো আইনি ভিত্তি তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়, ফলে জব্দ রাখা অর্থ আটকে রাখার আইনি প্রক্রিয়া থমকে যায়।

শওকত আলীর বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের জুলাই মাসে তদন্ত শুরু করে এবং তার ব্যাংক হিসাব সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আলাদাভাবে অর্থ পাচার, কর ফাঁকি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধান চালায়। কিন্তু ফেব্রুয়ারির ১৯ তারিখের বার্তায় এনসিএ যখন লন্ডনের হিসাবে অর্থ আটকে রাখার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা জানায়, তখনও বাংলাদেশের তদন্তকারী সংস্থাগুলো কোনো নিশ্চিত আইনি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।

ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখে বিএফআইইউ জানায়, শওকত আলী তাদের কাছে ‘পারসন অব ইন্টারেস্ট’ এবং তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান। তবে এগুলো ছিল নিছক অনুসন্ধান পর্যায়। ২৫ মিলিয়ন ডলারের সঙ্গে ওই নির্দিষ্ট অপরাধগুলোর সরাসরি যোগসূত্র স্থাপনের মতো শক্তিশালী কোনো তথ্য বা বাংলাদেশে সম্পদ ক্রোকের প্রমাণ তখনো ছিল না। এনসিএ বারবার জানতে চেয়েছিল তদন্তের নেতৃত্ব কে দিচ্ছেন এবং মামলার বর্তমান অগ্রগতি কতটুকু, কিন্তু সেই প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

ফেব্রুয়ারির ২৫ তারিখে বিএফআইইউ বিস্তারিত তথ্য দিয়ে জানায়, শওকত আলী বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। এনবিআর’র যৌথ কর কমিশনার মোহাম্মদ দাউদ হোসেন, সিআইডি’র পরিদর্শক গোলাম সরোয়ার এবং দুদকের উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান নিজ নিজ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে বিদেশি সংস্থাটির কাছে দেশের বাইরে থাকা সেই অর্থের সঙ্গে অপরাধের যোগসূত্র দেখানোর মতো কোনো অগ্রগতি ছিল না।

আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে অপারেশনাল ব্যবস্থা বা ওএসজেএ না থাকায় তথ্যের আদান-প্রদান আরও জটিল হয়ে পড়েছিল। ২৩শে ফেব্রুয়ারি এনসিএ কর্মকর্তা ইয়ান পোর্টার জানান, এই বিশেষ অনুমোদনের অভাব তথ্য ভাগাভাগিতে বড় বাধা সৃষ্টি করেছে। অবশেষে ২৭শে ফেব্রুয়ারি এনসিএ জানায়, তারা এই বিষয়ে আর কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কারণ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তখন পর্যন্ত কোনো চার্জশিট বা আইনি ভিত্তি প্রদান করা সম্ভব হয়নি।

পরবর্তীতে ১৫ই মার্চ বিএফআইইউ এনসিএকে জানায়, শওকত আলীর বিদেশে অর্থ পাঠানোর কোনো অনুমোদন ছিল না। কিন্তু এনসিএ’র আইনি ফ্রেমওয়ার্কে এই যুক্তিটি ছিল দুর্বল। কারণ যুক্তরাজ্যে ১৯৭৯ সালের অক্টোবরের পর থেকেই বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের বিধিনিষেধ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। এদিকে এনবিআর তার বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের কর দাবি উত্থাপন করে, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এই ২৫ মিলিয়ন ডলার লন্ডন শাখার হিসাবে চার সপ্তাহ আটকে ছিল। এই সময়েই বাংলাদেশ সরকার কঠোর আইনি তৎপরতা দেখাতে পারলে অর্থটি উদ্ধার করা সম্ভব হতো। আইনি ভিত্তি ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের অভাবে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ অর্থটি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় এবং তা দুবাইয়ের পথে চলে যায়। ৮ই জুন বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিভিন্ন মহলে বিএফআইইউ’র ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যার বার্ষিক গড় প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। এই প্রেক্ষাপটে অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে তদন্তের দুর্বলতা এবং মামলা পরিচালনার অক্ষমতা প্রকটভাবে ধরা পড়েছে। বর্তমান সরকার বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে বিভিন্ন দেশের সাথে আইনি সহায়তার প্রক্রিয়া শুরু করলেও, এই ২৫ মিলিয়ন ডলারের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা ব্যর্থতা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই জবাবে বিএফআইইউ জানায়, ২০২৫ সালের ১লা জুলাই থেকে ২৯শে আগস্ট পর্যন্ত শওকত আলীর হিসাব সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রাপ্ত নথি বলছে, এনসিএ সে সময় বাংলাদেশের কাছে যে পদক্ষেপ চেয়েছিল এসব তদন্তে তা ছিলনা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২৩ ফেব্রুয়ারির এক বার্তায় সংস্থাটির কর্মকর্তা ইয়ান পোর্টার জানান, বাংলাদেশি তদন্ত সংস্থাগুলোর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির জন্য নির্দিষ্ট অপারেশনাল ব্যবস্থা বা ওএসজেএ প্রয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে তখনও বাংলাদেশ মামলা করে অভিযোগপত্র দিলে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধ উভয় দেশেই অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হলে অর্থ আটকাতে আদালতে যেতে পারতো এনসিএ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অর্থাৎ, বাংলাদেশ চাইলে তখনও আইনি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যুক্তরাজ্যের সহায়তা চাইতে পারত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ১৫ই মার্চ এনবিআর’র বৃহৎ করদাতা ইউনিট ৩০৬ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার কর দাবি করে এবং ৩০ মার্চের মধ্যে তা পরিশোধের সময় দেয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরে ১৯৮৭ সালের ফাইন্যান্স অ্যাক্টের মাধ্যমে ১৯৪৭ সালের এক্সচেঞ্জ কন্ট্রোল অ্যাক্টও আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content