আইন-আদালত

জিয়াউল আহসানের অপারেশন নিয়ে ট্রাইব্যুনালে সাবেক কর্মকর্তার চাঞ্চল্যকর

  প্রতিনিধি 17 September 2026 , 9:32:14 প্রিন্ট সংস্করণ

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত শতাধিক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্য দিয়েছেন র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী। বৃহস্পতিবার দেওয়া তার এই জবানবন্দিতে উঠে এসেছে ভয়ংকর সব রোমহর্ষক তথ্য। তিনি জানান, ২০১০ সালের মে মাসে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী নজরুল ইসলামসহ চারজন এবং বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সরকারের সমালোচক হিসেবে চিহ্নিত অন্তত ১৫ জন ভিকটিমকে নৃশংসভাবে প্রাণনাশের শিকার হতে হয়েছে।

সাক্ষীর বর্ণনা অনুযায়ী, এসব হত্যাকাণ্ডকে জিয়াউল আহসান সামরিক সাংকেতিক ভাষায় ‘গল্ফ অপারেশন’ হিসেবে অভিহিত করতেন। অপারেশনগুলোর সময় ঢাকা থেকে নিজস্ব বিশ্বস্ত দল ও ভিকটিমদের নিয়ে তিনি বরগুনার পাথরঘাটার চরদোয়ানীতে যেতেন। ভিকটিমদের এমনভাবে ঢেকে রাখা হতো যেন তাদের পরিচয় শনাক্ত করা না যায়। ট্রলারে তোলার পর মাথার কাছে বালিশ চেপে ধরে গুলি করে তাদের হত্যা করা হতো। মরদেহ যেন নদীতে ভেসে না ওঠে, সেজন্য পেট চিরে তাতে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হতো। গল্ফ খেলায় বল যেমন গর্তে ফেলা হয়, তেমনি মানুষ হত্যা করে লাশ গুম করার প্রক্রিয়াকে জিয়াউল আহসান এমন সাংকেতিক নাম দিয়েছিলেন।

প্রসিকিউশনের ভাষ্যমতে, বিডিআর বিদ্রোহের প্রত্যক্ষদর্শী নজরুলসহ চারজনকে একই কায়দায় হত্যা করা হয়েছিল। নজরুলের মরদেহ পরে নদী থেকে ভেসে উঠলে জিয়াউল আহসান বিষয়টি নিয়ে কোনো তদন্ত বা বাড়াবাড়ি না করে কেবল ফলোআপ করতে নির্দেশ দেন। মূলত বিডিআর হত্যাকাণ্ডের সাক্ষীদের মুখ চিরতরে বন্ধ করতেই পরিকল্পিতভাবে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। এ সময় প্রতিটি অভিযানে ট্রলার চালাতেন আলকাস মাঝি। তিনি বিষয়টি স্থানীয়ভাবে প্রকাশ করতে শুরু করলে জিয়াউল আহসান তাকেও গুম করার পরিকল্পনা করেন। পরবর্তীতে এক ফোন কলের পর থেকেই আলকাস মাঝি নিখোঁজ হন, যা পরিস্থিতিগত সাক্ষ্য অনুযায়ী তার হত্যারই ইঙ্গিত দেয়।

জিয়াউল আহসানের এসব কর্মকাণ্ড আড়াল করতে সাজানো ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা নাটকের আশ্রয় নেওয়া হতো বলে আদালতে জানান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, তৎকালীন র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের প্রধান সোহেলের সহায়তায় পছন্দের কিছু সাংবাদিককে লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে চরদোয়ানীতে নিয়ে যাওয়া হতো। তাদের ব্রিফিং অনুযায়ী গণমাধ্যমে সাজানো বন্দুকযুদ্ধের গল্প প্রচার করা হতো। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চলমান তদন্তে এই তথ্যগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের সহযোগী বা ‘অ্যাবেটমেন্ট’ হিসেবে যুক্ত করা হচ্ছে।

জবানবন্দিতে মেজর (অব.) সাব্বির উল্লেখ করেন যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে জিয়াউল আহসানের সরাসরি যোগসাজশ ও একক কর্তৃত্ব ছিল। ফলে র‌্যাব-৮ কিংবা র‌্যাব-৬ এর কোনো কর্মকর্তারই তার নির্দেশ অমান্য করার সাহস ছিল না। একবার এক অপারেশনের পর গাড়িতে গম্ভীর পরিস্থিতিতে জিয়াউল আহসান মন্তব্য করেছিলেন, ‘এরা রাষ্ট্রের শত্রু, এদের এইভাবেই শেষ করে দিতে হয়।’ এই নৃশংসতার প্রতিবাদ করতে গিয়ে ব্যাটালিয়ন অধিনায়কের কাছ থেকেও কোনো প্রতিকার না পেয়ে এবং গভীর অনুশোচনা থেকে তিনি শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে দেন। প্রসিকিউশন মনে করে, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিণতি উন্মোচনে ও জিয়াউল আহসানের অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে মেজর সাব্বিরের এই সাক্ষ্য একটি অকাট্য ও ঐতিহাসিক দলিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এই মামলার একমাত্র আসামি সাবেক এনটিএমসি মহাপরিচালক ও র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার তৎকালীন পরিচালক জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে এই সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: লাশ ফেলার মাঝি আলকাস ও হত্যাকাণ্ডের আলামত লোপাট: অভিযানের ট্রলার চালক আলকাস মাঝির বিষয়েও আদালতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়া হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এরপর সাব্বিরকে দায়িত্ব দেয়া হয় আলকাসকে ‘এলিমিনেট’ (হত্যা) করতে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর কিছুদিন পরই জিয়াউলের ফোন পেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান আলকাস মাঝি এবং এরপর থেকে তিনি আর ফিরে আসেননি।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content