প্রতিনিধি 12 August 2026 , 1:44:48 প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের জ্বালানি খাতের বড় একটি অংশ এখন আমদানিনির্ভর, যা দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বর্তমানে ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৫ শতাংশেরও বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, আর বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৯ শতাংশের উৎসও আমদানি করা বিদ্যুৎ। গত প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। এর ফলে গ্যাসের তীব্র সংকটের পাশাপাশি আমদানি করা বিদ্যুতের সরবরাহ কমে যাওয়ায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে। এর ফলে টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাসের সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসে। যদিও দুই সপ্তাহ পর গত বৃহস্পতিবার সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পথে ছিল, কিন্তু সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়ার কারণে গত সোমবার সন্ধ্যা থেকে সরবরাহ পুনরায় হ্রাস পেয়েছে। এতে দিনে ২৫ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।

গ্যাসের এই তীব্র সংকটের প্রভাব পড়েছে জনজীবনে। রান্নার চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যাহত হয়। যানবাহনেও সিএনজি পেতে দীর্ঘ সারি পড়ে যায় ফিলিং স্টেশনে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আমদানিনির্ভরতার কারণে বৈশ্বিক যেকোনো সংকটে বারবার ব্যাহত হয় দেশের জ্বালানি সরবরাহ। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে দেশে গ্যাসের সংকট বেড়ে যায়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলা চালায়। এর আগে ২০২৪ সালে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে প্রায় সাড়ে তিন মাস বন্ধ ছিল একটি টার্মিনাল। পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, এক্সিলারেটের টার্মিনালে দুটি বয়লার আছে, যার প্রতিটি ৩০ কোটি ঘনফুট সক্ষমতার। একটি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অক্ষত বয়লারটি থেকে গত বৃহস্পতিবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি চালু করতে কাজ চলছে, তবে এটি পরীক্ষা করতে বর্তমানে চালু বয়লারটি বন্ধ করতে হবে, যা সরবরাহকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম জানান, এলএনজির কার্গো পাশেই আছে, কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার জন্য টার্মিনালে এলএনজি স্থানান্তর করা যাচ্ছে না। জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা এক্সিলারেট এনার্জিকে একটি কর্মপরিকল্পনা জমা দিতে বলেছেন। বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। এলএনজি থেকে আসে ১০৫ কোটি ঘনফুট। এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধের পর সামিটের টার্মিনাল সক্ষমতার চেয়ে বেশি সরবরাহ দেওয়ার চেষ্টা করলেও বর্তমানে সব মিলিয়ে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২১৩ কোটি ঘনফুট, যা গত তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে না পারায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমছে না। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। গত সোমবার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, গরম বাড়ায় বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু গ্যাসের সংকটে উৎপাদন কমেছে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট। ব্যয়বহুল হওয়ায় তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র বলছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিল বকেয়া থাকায় কয়লার আমদানি ব্যাহত হয়েছে। ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়েছে ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র। ঝড়-বৃষ্টিতে কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন ধরে রাখতে পারেনি কেন্দ্রটি। দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানিসংকট সমাধানে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, বিগত সময়ে টেকসই উন্নয়ন না হওয়ায় একটি টার্মিনাল বন্ধেই সারা দেশে গ্যাসের হাহাকার পড়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে জোর না দেওয়ায় এখন গ্যাসের উৎপাদন টানা কমছে। ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি এবং ২০১৩ সাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয়। এখন জ্বালানিসংকটের তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই, আমদানি করতেই হবে। এর পাশাপাশি দেশীয় জ্বালানির উৎস বাড়াতে হবে। যদিও বর্তমান সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিয়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, দেশ অনেক আগেই আমদানিনির্ভর হয়ে গেছে। তিনি বলেন, আয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে সাশ্রয়ী জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব খনিজ সম্পদের সঠিক ব্যবহারই এখন জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র পথ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর মধ্যে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট ও দেশি কোম্পানি সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট।
প্রতিটি বয়লারের সক্ষমতা ৩০ কোটি ঘনফুট।
অন্তত ১২ ঘণ্টা বন্ধ রাখার পর আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে।
সমুদ্রে পরিস্থিতির উন্নতি হলে আজ বুধবার থেকে সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে।
ইরান পাল্টা হামলা চালায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের মার্কিন ঘাঁটিতে।
সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়া দেখা দিলেই এলএনজি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়।
এরপর জ্বালানি বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ওই সময় দিনে প্রায় ৫৭ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করেছে তারা।
এর পর থেকে প্রতিদিন ৫০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছিল।
গ্যাস সরবরাহে যুক্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানের সূত্র বলছে, গতকাল সন্ধ্যায়ও ২০ কোটি ঘনফুট করে সরবরাহ করেছে সামিট।
দেশীয় গ্যাস থেকে এসেছে ১৬৩ কোটি ঘনফুটের মতো।
চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে গ্যাস বিতরণ সংস্থাগুলোকে।
গতকাল ‘জ্বালানি খাতের সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার টেকসই উন্নয়ন করেনি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া, সরকার সেটা সামাল দিচ্ছে।
জ্বালানিসংকটে মানুষের কষ্ট লাঘবে চেষ্টা করছে সরকার।
গত রোববার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট।
তবে গতকাল দুপুর থেকে আবার বাড়তে থাকে।
গতকাল সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে বেলা তিনটায়, ৩ হাজার ৪৬৫ মেগাওয়াট।
আর কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ উৎপাদনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি থকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে দুর্নীতি, লুণ্ঠন বন্ধ করলে আর্থিক চাপ তৈরি হতো না।
এ ছাড়া আমদানি ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক হলেও সংকট এড়ানো সম্ভব।
সূত্র: প্রথম আলো



















