সারাদেশ

পিরোজপুরে হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প লুটপাট: তদন্তে বেরিয়ে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য

  প্রতিনিধি 31 August 2026 , 12:47:51 প্রিন্ট সংস্করণ

পিরোজপুর জেলায় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে হাজার কোটি টাকা লুটপাটের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সরকারি নথিপত্রে অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে অনেক প্রকল্পের কোনো চিহ্নই নেই। যেমন, সদর উপজেলার কদমতলা গ্রামে ৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ব্রিজ নির্মাণের কথা থাকলেও সেখানে বাস্তবে রয়েছে কেবল একটি বাঁশের সাঁকো। অথচ এই প্রকল্পের পুরো টাকা সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজের ভাই ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলামের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘ইফতি ইটিসিএল’ তুলে নিয়েছে।

নাজিরপুর উপজেলার প্রায় ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ নাজিরপুর-বৈঠাকাটা সড়ক নির্মাণেও একই ধরনের জালিয়াতি হয়েছে। বরিশাল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের আওতায় ৪টি প্যাকেজে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সড়ক নির্মাণের কার্যাদেশ পেয়েছিল মিরাজুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাস্তবে কোনো কাজ না করেই প্রকল্পের পুরো অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। ২০২০-২০২১ অর্থবছর থেকে পরবর্তী চার অর্থবছরে জেলায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ আসে, যার বড় একটি অংশ এই সংঘবদ্ধ চক্র লুটপাট করেছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এখন এই লুটপাটের বিস্তারিত তদন্ত করছে।

তদন্তে সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজ, তার পরিবারের ৫ সদস্য এবং সরকারি দপ্তরের ২২ জন অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। লুটপাটের কারণে জেলাজুড়ে শত শত রাস্তা ও সেতুর কাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। এসব প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি কার্যাদেশ ছিল মিরাজুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন ৮টি লাইসেন্সের অধীনে। এই জালিয়াতিতে পিরোজপুর এলজিইডি’র সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তারসহ ঢাকা ও বরিশাল অফিসের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা এবং জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের কর্মীরা সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

মহিউদ্দিন মহারাজ আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য হওয়ার পর থেকেই তার স্বজনদের মাধ্যমে জেলায় লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেন। তার এই প্রভাবের পেছনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব তোফাজ্জেল হোসেন মিয়ার ভূমিকা ছিল বলে জানা গেছে। বর্তমানে দুদক পিরোজপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা ১৭টি প্রকল্পের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৮টি প্রকল্পের তদন্তে প্রায় ১ হাজার ৭৩ কোটি টাকা দুর্নীতির সত্যতা পেয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ৫ জনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২০২১ থেকে পরবর্তী চার অর্থবছরে ১ হাজার ৮১০টি স্কিমের জন্য ৩,৫৫৯ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল, যার মধ্যে ১,৬৪৭ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া, ৪৮০ কিলোমিটার গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা পাকা করার ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পে কোনো কাজ না করেই প্রায় ৯১ কোটি টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কোথাও কাজ হয়নি, অথচ কাগজে-কলমে ৭৭ শতাংশ অগ্রগতি দেখানো হয়েছে।

ভাণ্ডারিয়া মহিলা কলেজ থেকে মন্ত্রী বাড়ি রোড এবং মাটিভাঙ্গা-কাঠালিয়া বর্ডার রোডের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতেও একই ধরনের জালিয়াতি হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের মেজারমেন্ট বুক বা ছাড়পত্র ছাড়াই সরাসরি জেলা দপ্তর ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের যোগসাজশে বিল পাস করা হয়েছে। এলজিইডি পিরোজপুরের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আজিজুর রহমান জানান, আগের প্রকল্পগুলোর অনিয়ম ও অসমাপ্ত কাজগুলো এখন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিলে এবং নতুন বরাদ্দ পাওয়া গেলে জনদুর্ভোগ লাঘবে কাজগুলো শেষ করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মিরাজ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জেলার একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি ও তাদের কাজের লোকজন এই লুটপাটের চক্রে জড়িত ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ ছাড়া শুধুমাত্র কাগজে কলমে ভুয়া প্রকল্প এবং একই স্থানে একাধিক কাজ দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে যার প্রধান সহযোগী পিরোজপুর এলজিইডি’র সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার, তার আরও দুই অসাধু সহযোগী, এলজিইডি’র ঢাকা ও বরিশাল অফিসের বেশ কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা। 27. প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২০-২০২১ থেকে পরবর্তী ৪টি অর্থবছরে ১৭টি প্রকল্পের মাধ্যমে পিরোজপুরে ১ হাজার ৮১০ টি স্কিমের জন্য ৩,৫৫৮.৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কাজগুলো থেকে ১,৬৪৭.৪৮ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর মধ্যে ৮টি প্রকল্পে তদন্ত শেষে প্রায় এক হাজার ৭৯ কোটি টাকা দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুদক।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content