সারাদেশ

শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন

  প্রতিনিধি 9 August 2026 , 5:49:07 প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। গত ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি নিয়ে ঢাকা গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এই ঘটনা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের চলমান প্রচেষ্টায় বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কি না, তা নিয়ে এখন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকেই তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশ সরকার বারবার ভারতের কাছে আপত্তি জানিয়ে আসছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছিল, যেন পতিত এই নেতাকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রচার বা বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়। তবে সেই অনুরোধ উপেক্ষা করেই গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেল বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানও যুক্ত ছিলেন।

ঘটনাটির পরপরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে। বিবৃতিতে বলা হয়, এই ধরনের আয়োজন দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ভারত সরকারকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। এরপরেও অনুষ্ঠানটির অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকার অসন্তুষ্ট। সরকারের নীতিনির্ধারক ও বিএনপি নেতাদের অনেকেও ভারত সরকারের এই ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছেন।

সাবেক কূটনীতিক ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির মনে করেন, এই ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের যে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছিল, তার জন্য মোটেও সহায়ক নয়। তিনি বলেন, ভারত সরকার এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বা তারা এই মতের সঙ্গে একমত নয় বলে দাবি করলেও, বাস্তবে এই ধরনের বক্তব্যের তেমন কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।

অন্যদিকে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক অমীমাংসিত ইস্যু রয়েছে যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, আমরা অবশ্যই আলোচনার টেবিলে বসতে আগ্রহী, তবে এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত ভারতকে নিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি দৃশ্যমান প্রচেষ্টা ছিল। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লার উপস্থিতি এবং তার আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর সেই সম্পর্কের উন্নতির ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড সেই প্রচেষ্টাকে আবারও চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এর আগেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর জন্য ভারত সরকারকে ‘নোট ভারবাল’ পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে ভারত সেই অনুরোধের বিষয়ে ইতিবাচক কোনো সাড়া দেয়নি। বর্তমানে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধের বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার উত্থাপন করা হলেও, ভারত সরকার কেবল বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়ে আসছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ অবশ্য মনে করেন, এই ঘটনায় বাংলাদেশ সরকারের ক্ষোভ প্রকাশ করাটা কিছুটা অপ্রয়োজনীয় ছিল। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষক একমত যে, ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনার এই ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির গত ৫ আগস্টের অডিও বক্তব্যের আগেও ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে সতর্ক করেছিলেন। ভারত হাসিনাকে কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সুযোগ দেবে না—এমন প্রত্যাশা ছিল ঢাকা সরকারের। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় সম্পর্কের টানাপোড়েন এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

শেখ হাসিনার এই সংবাদ সম্মেলনকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি এখন দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বাংলাদেশ সরকার চায় ভারত যেন তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো ধরনের দেশবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে না দেয়।

পরিশেষে, দুই দেশের সম্পর্কের এই শীতলতা নিরসনে এখন দিল্লির পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা। সম্পর্ক উন্নয়নের যে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য ছিল, তা বজায় রাখতে হলে ভারতের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার এই কূটনৈতিক জটিলতা নিরসনে আগামী দিনগুলোতে উভয় দেশ কীভাবে পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

গত ৫ অগাস্টের ওই সংবাদ সম্মেলনের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কিনা, সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়ে যেতে পারে কিনা- এসব প্রশ্ন এখন উঠছে।

পূর্বের ঘোষণা মতো ৫ আগস্ট ঠিকই ভারতে বসে কনফারেন্স করেন পতিত শেখ হাসিনা।

তবে এরই মধ্যে গত ৫ অগাস্ট ভারতে আশ্রয়ে থাকা শেখ হাসিনার নয়া দিল্লিতে গণমাধ্যমে সরাসরি কথা বলার ঘটনা ভিন্ন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

প্রায় দেড় হাজার মানুষ হত্যা এবং অসংখ্য মানুষকে স্থায়ীভাবে বিকলাঙ্গ করে দেওয়ার পরও তার মধ্যে নেই ন্যুনতম অনুশোচনা।

কিন্তু বরাবরের মতোই থোড়াই কেয়ার ভারত।

ঘটনাটিকে ঘিরে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ঢাকা।

হাসিনা গণমাধ্যমে কথা বলার দিনেই রাতে কড়া ভাষায় বিবৃতি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তবে পরিস্থিতিটাকে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছেন সাবেক কূটনীতিকরা।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ঠিক কোন দিকে যাচ্ছে?

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক একেবারেই তলানীতে গিয়ে ঠেকেছিল বলে সেসময় কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছিলেন।

তারও আগে গত বছরের ডিসেম্বরে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।

এর ব্যাখ্যায় কর্মকর্তারা বলছেন, শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের আগেই বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা ভারতকে জানান হয়েছিল।

বুধবার (৫ আগস্ট) রাতেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই আয়োজন বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে ভারত সরকারকে আগেই উদ্বেগ জানান হয়েছিল।

যেগুলো আলোচনার মাধ্যমে, ডায়লগের মাধ্যমে, বৈঠকের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।

হুমায়ুন কবির মনে করেন, সরকার যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মতের প্রতিফলনটা এসেছে।

যদিও বিশ্লেষকেরা বলছেন, ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টায় দু’পক্ষেরই সদিচ্ছা দেখানো উচিত।

কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content