জাতীয়

উপজেলা নির্বাচনে কঠোর আচরণবিধি: পোস্টার-মিছিল নিষিদ্ধ ও এআই ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা

  প্রতিনিধি 7 September 2026 , 5:33:40 প্রিন্ট সংস্করণ

আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে অধিকতর অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নতুন ‘উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালা-২০২৬’ জারি করেছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত এই নতুন বিধিমালার গেজেট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। নতুন এই বিধিতে নির্বাচনী প্রচারণার ধরনে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পোস্টার ও মিছিল-শোডাউনে নিষেধাজ্ঞা

নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহারের প্রথা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি এখন থেকে পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। এছাড়া ভবন, দেয়াল, গাছ, বেড়া, বিদ্যুতের খুঁটি, সরকারি স্থাপনা, সেতু ও কালভার্টের মতো স্থানে প্রচারসামগ্রী লাগানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের প্রকাশ্য মিছিল বা শোভাযাত্রা করা যাবে না। ট্রাক, বাস, মোটরসাইকেল, নৌযান ও ট্রেনসহ বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করে মিছিল বা শোডাউন করাও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। নির্বাচনী প্রচারে হেলিকপ্টার বা অন্য কোনো আকাশযান ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

ডিজিটাল প্রচারণা ও এআই ব্যবহারে কঠোরতা

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার সুযোগ রাখা হলেও তা কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। প্রচারণা শুরুর আগে প্রার্থীকে কোন কোন মাধ্যম ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করতে হবে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় হওয়া অর্থ প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অপব্যবহার ঠেকাতে বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা তার সমর্থকরা এআই ব্যবহার করে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষপূর্ণ বা ব্যক্তিগত আক্রমণমূলক কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করতে পারবেন না। নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করতে পারে এমন কোনো ভুয়া তথ্য ছড়ানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও পেশিশক্তির ব্যবহার রোধ

সরকারি সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা নির্বাচনী কাজে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকারি যানবাহন, প্রচারযন্ত্র বা অন্য কোনো সরকারি সম্পদ নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিসে প্রচারণা চালানো নিষিদ্ধ। ভোটারদের প্রভাবিত করতে অর্থ, খাদ্য, পানীয় বা উপহার বিতরণ করা যাবে না। নির্বাচনের দিন ভোটারদের কেন্দ্রে আনা-নেওয়ার জন্য যানবাহন ভাড়া বা ব্যবহারের সুযোগও থাকবে না।

শাস্তি ও কমিশনের ক্ষমতা

  • নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া হয়েছে।
  • বিধিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
  • নির্বাচনী ব্যয়সীমা অতিক্রম করা, অর্থ বা পেশিশক্তি দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করা এবং সরকারি সুবিধা ব্যবহার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
  • নির্বাচন কমিশন কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
  • নির্ধারিত সীমার বাইরে ক্যাম্প স্থাপন ও মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিমালায় নির্দিষ্ট নিয়ম কঠোরভাবে মানতে হবে।

নির্বাচন কমিশনের নতুন এই বিধিমালার মূল লক্ষ্য হলো উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করা এবং প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে পোস্টার, মিছিল ও শোডাউন বন্ধ এবং ডিজিটাল প্রচারণায় এআই-নির্ভর অপপ্রচার ঠেকানোর বিধান এবারের উপজেলা নির্বাচনের প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content