জাতীয়

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী: রাজনৈতিক বাঁক বদল ও প্রত্যাশার দুই বছর

  প্রতিনিধি 5 August 2026 , 1:00:59 প্রিন্ট সংস্করণ

আজ ৫ই আগস্ট, ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ‘৩৬শে জুলাই’-এর দ্বিতীয় বার্ষিকী। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই দিনটি এক অভূতপূর্ব অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান, যা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য বিলোপ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাজপথে নেমে আসা জনতার এই বিজয় বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন। রাজনৈতিক সরকারের অধীনে প্রথমবারের মতো জাতীয় দিবস হিসেবে সরকারি ছুটির দিনে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

অভ্যুত্থানের দুই বছর পর মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব পালনের পর গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। বর্তমানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দুটি অধিবেশন সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট বিরোধী দলে এবং তরুণদের নিয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

নতুন সরকার ব্যয় সংকোচন ও গণমুখী নানা উদ্যোগ নিলেও বিদ্যুৎ, গ্যাস, নিত্যপণ্যের দাম এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের বিষয়গুলো নিয়ে সরকারের সঙ্গে অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর টানাপড়েন বাড়ছে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ বর্তমানে মাঠছাড়া অবস্থায় রয়েছে; দলের শীর্ষ নেতারা পলাতক বা কারাবন্দি এবং দলটির কার্যক্রম সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতারা ভারতে অবস্থান করছেন, যা দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গত দুই বছরে বাংলাদেশ স্বৈরাচারের কবল থেকে মুক্ত হলেও নতুন রাজনৈতিক জটিলতা ও অর্থনৈতিক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণই এখন সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ‘জুলাই চেতনায় গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে আজ সারা দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বুধবার সকাল ৬টা ১ মিনিটে শাহবাগস্থ জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এছাড়া বেলা ১২টায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম এবং সভাপতিত্ব করবেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।

দিবসটি উপলক্ষে দেশের সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে। জাতীয় জাদুঘর, সামরিক জাদুঘর ও বিজ্ঞান জাদুঘরসহ বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র শিশুদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এছাড়া সরকারি হাসপাতাল, কারাগার ও বৃদ্ধাশ্রমে বিশেষ প্রীতিভোজের ব্যবস্থা রয়েছে। রাজধানীসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আলোচনা সভা ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।

আজকের দিনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো গণভবনে স্থাপিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর উদ্বোধন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সকালে এই জাদুঘরের উদ্বোধন করবেন। একইসঙ্গে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল শহীদদের কবর জিয়ারত, স্মৃতি ফলকে শ্রদ্ধা নিবেদন ও আলোচনা সভাসহ বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করছে।

রক্তস্রোত, ঘটনাবহুল ৫ই আগস্টের দ্বিতীয় বার্ষিকী আজ।

২০২৪-এর জুলাইয়ের আন্দোলনের বড় লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার বদল ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন।

বড় অংশীদার ’২৪-এর আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়া তরুণ-শিক্ষার্থীদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি।

ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে এদিন অবসান ঘটেছিল দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের।

বৈষম্য, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়টা পার হয়েছে নানা টানাপড়েনের মধ্যদিয়ে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের রূপরেখা তৈরির নামে দীর্ঘ সময় পার করে জুলাই জাতীয় সনদ ঘোষণা করে।

নানামুখী চাপে পড়ে নির্বাচন ও গণভোটের আয়োজন করে।

নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয় বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন জোট।

বহু আকাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ইতিমধ্যে দু’টি অধিবেশন পার করেছে।

এমন পরিস্থিতিতে অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা সংশয়।

২৪ এর আন্দোলনে দেশে নতুন একটি রাজনৈতিক ধারা তৈরি করেছে।

প্রতিষ্ঠার বছর পেরোনোর আগেই তারা জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত চব্বিশটি মাসে বাংলাদেশ যেমন স্বৈরাচারের জগদ্দল পাথর বুক থেকে নামিয়ে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পেরেছে, তেমনি নতুন ব্যবস্থার ভেতরে এক ধরনের নতুন রাজনৈতিক জটিলতা ও অর্থনৈতিক টানাপড়েনের মুখোমুখিও হয়েছে।

ওদিকে ‘জুলাই চেতনায় গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’- প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ সারা দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ পালিত হবে।

একইসঙ্গে দেশের সব জেলা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনসমূহেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে।

দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভার পাশাপাশি রচনা, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content