প্রতিনিধি 4 August 2026 , 2:10:57 প্রিন্ট সংস্করণ

কয়েকদফা দিন ঘোষণার পর অবশেষে খুলছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। বুধবার সকাল ৯ টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাদুঘরটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের পরপরই এটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। সরেজমিনে দেখা যায়, উদ্বোধনের দিন ধার্য থাকলেও এখনো পুরো কাজ শেষ হয়নি। শ্রমিকরা শেষ মুহূর্তের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঘিরেও চলছে তোড়জোড়। কালো রডে ঘেরা নতুন প্রবেশ গেটের পাশে ফাঁকা জায়গায় সাদা তাঁবু টাঙিয়ে তৈরি করা হচ্ছে উদ্বোধনী মঞ্চ। মঞ্চের সামনে আগত অতিথিদের বসার জায়গা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং এসব কাজের জন্য অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

বিশেষায়িত এই জাদুঘরটির প্রতিটি কোণে গত ১৭ বছরের স্বৈরশাসনের নির্যাতন, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের নানা স্মৃতিচিহ্ন ও দালিলিক প্রমাণ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রবেশ পথ দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায় লম্বা সাদা পাথরের ওপর আঁকা পুরো জাদুঘরের পূর্ণাঙ্গ ম্যাপ। পার্কিং, স্মারক বিবরণী, বহির্গমন, জুলাই মঞ্চ, মেমোরিয়াল, প্রতীকী আয়নাঘর, পাবলিক টয়লেট ও থিয়েটারের অবস্থান ম্যাপে চিহ্নসহ উল্লেখ করা হয়েছে। জাদুঘরের ভেতরে সবুজ ঘাস দিয়ে উন্মুক্ত জায়গায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সারি সারি প্রতীকী কবর তৈরি করা হয়েছে। কবরের সামনে সাদা পাথরের নাম ফলকে খোদাই করে লেখা হয়েছে শহীদদের নাম।
জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন ছবি ও তথ্য সংযুক্ত করে পুরো জাদুঘরের মাঠ ও চলাচলের রাস্তার পাশে ব্যানার তৈরি করা হয়েছে। আছে পানির ফোয়ারা এবং আন্দোলনে স্লোগান দেয়া জুলাই যোদ্ধার প্রতিকৃতি। শুধু জুলাই নয়, ১৯৮২ সালে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে যোগ দেয়া থেকে শুরু করে ১৯৮৬ এর নির্বাচনে গণতন্ত্রের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বেঈমানি, ১৯৯১ এ সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা, ২০০৬ এ লগি-বৈঠার তাণ্ডব ও ১/১১ এর সময়ের নানা ঘটনার ছবি ও তথ্য এখানে তুলে ধরা হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সময়ে সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের বিভিন্ন ছবিও তথ্যসহ সংরক্ষিত আছে।
গণভবনের লাল দেয়ালে বুয়েটের আবরার ফাহাদ থেকে শুরু করে রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত গণভবনের ভেতরেও বিভিন্ন চিত্রের মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শয়নকক্ষ, আলমারি, পালঙ্ক, বালিশ ও ক্ষতিগ্রস্ত আসবাবপত্র আলাদা করে রূপ দেয়া হয়েছে। খাটে বিছানো সাদা চাদরে লেখা রয়েছে শহীদ জুলাই যোদ্ধাদের নাম। তৈরি করা হয়েছে প্রতীকী আয়নাঘর ও টর্চার সেল, যেখানে রাখা হয়েছে আয়নাঘরে ব্যবহৃত ইলেকট্রিক শক দেয়ার বিশেষ চেয়ার। ছাত্রদের ব্যবহৃত পানির বোতল আলাদা তাকে সাজানো হয়েছে, কোনোটিতে আঁকা হয়েছে মীর মুগ্ধের ছবি। আওয়ামী লীগ আমলের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে তৈরি করা হয়েছে আলাদা কর্নার, যেখানে আছে বিশেষ লাল টেলিফোন। জুলাই হত্যাযজ্ঞের অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে সাবেক সিটি মেয়র ফজলে নূর তাপসের ছবি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে আলাদা লাল গ্লোব।
শাপলা চত্বর থেকে শুরু করে জুলাইয়ের রক্তাক্ত পাঞ্জাবি, গুলিবিদ্ধ যোদ্ধা ও রাস্তায় সেজদা দেয়ার ছবি বাঁধাই করে রাখা হয়েছে। ছবির পাশাপাশি ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র ফুটিয়ে তুলতে তৈরি করা হয়েছে আলাদা ভিডিও গ্যালারি, যেখানে বসে সহজেই ৩৬ জুলাই আন্দোলনের তৎকালীন চিত্র দেখা যাবে। জাদুঘরের ভেতরে মানুষের চলাচলের জন্য গাড়ি, মোটরসাইকেল পার্কিং ও হুইল চেয়ার ব্যবহারের দিকনির্দেশনা সম্বলিত ছবিযুক্ত সাইনবোর্ড তৈরি করা হয়েছে।
এতদিন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও উদ্বোধনের আগ দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ড. মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত চেতনা মানুষের সামনে তুলে ধরতেই জাদুঘরটি সাজানো হয়েছে। ভবিষ্যতে কেউ স্বৈরশাসক হতে চাইলে এই জাদুঘর তাদের জন্য শিক্ষণীয় হবে। তিনি আরও বলেন, যদি ভবিষ্যতে কোনো শাসক আবার ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে চান, তবে এই জাদুঘর তাকে মনে করিয়ে দেবে যে জনগণই রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী এবং জনগণের প্রতিরোধের মুখে স্বৈরশাসনের পতন অনিবার্য। একসময় যে ভবন ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, সেটিই এখন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের জীবন্ত দলিলে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আপসহীন সংগ্রাম, ৩৬ জুলাইয়ের জনতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ, গত ১৭ বছরের খুন, গুম ও নির্যাতনের ইতিহাস এবং সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত থাকবে এই জাদুঘরে। এটি শুধু একটি ভবন নয়, বরং লাখো মানুষের প্রতিরোধ, ত্যাগ ও সংগ্রামের এক জীবন্ত স্মারক। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থায়ী নিয়োগ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সাপ্তাহিক ছুটি বৃহস্পতিবার ও সরকারি বন্ধের দিন বাদে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জাদুঘরটি খোলা থাকবে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রবেশ ফি ৫০ টাকা, শিশুদের জন্য ২০ টাকা, সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ৫০০ টাকা এবং অন্যান্য দেশের নাগরিকদের জন্য ২০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
উপরন্তু বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে এর নির্মাণ কাজের দায়িত্বে থাকা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বিরুদ্ধে।
বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর-এর ১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী অতিরিক্ত দায়িত্বে কাজ করছেন।
প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য প্রবেশ ফি ধরা হয়েছে ৫০ টাকা।
তাদের চারপাশে আছে অগণিত প্রতীকী হাত।
তবে আন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে একাধিকবার জাদুঘরটি উদ্বোধনের ঘোষণা দিলেও তা উদ্বোধন করতে পারেনি।
সূত্র: মানবজমিন



















