প্রতিনিধি 8 August 2026 , 5:48:21 প্রিন্ট সংস্করণ

হঠাৎ করেই গত জুন মাসের শুরু থেকে স্কুলে আর আসছিল না আবু রায়হান। অথচ মে মাস পর্যন্ত সে নিয়মিত ক্লাস করেছে। ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার পিঠাসূতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এই ছাত্র কেন আর স্কুলে আসছে না, তা নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। তারাকান্দা উপজেলার ভুগলী গ্রামে রায়হানের বাড়ি। তার বাবা আজহারুল ইসলাম দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান। ৫ আগস্ট দুপুরে রায়হানের বাড়িতে গিয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর এই প্রতিবেদক। শিশুটির মা রেখা আক্তার বললেন, ‘ছেলেরে ঢাকায় দরজির কাজ শিখনের লাইগা দিছি।’

রায়হানের মতো দুই মাস বা তারও বেশি সময় ধরে ক্লাসে আসছে না—পিঠাসূতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা অন্তত ১০। তাদেরই একজন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া আক্তার। এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সে নিয়মিত ছিল। শিশুটির মা তাছলিমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, মেয়ে বড় হচ্ছে, রাস্তাঘাটে নানা ধরনের সমস্যা আছে। তাই গ্রামের একটি কওমি মাদ্রাসায় মেয়েকে ভর্তি করিয়েছেন। কাগজে–কলমে পিঠাসূতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১০৪ জন। শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ২০২২ সালে শিক্ষার্থী ছিল ১৫০ জন। এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিনতী রানী কর বলেন, ঝরে পড়া রোধে নিয়মিত ‘হোম ভিজিট’ করা হচ্ছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।
ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সার্বিকভাবে পুরো জেলাতেই সরকারি প্রাথমিকে শিক্ষার্থী কমছে। জেলার ১৩টি উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২ হাজার ১৪০। চলতি বছরে (২০২৬ সাল) এসব বিদ্যালয়ে পড়ছে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৮২২ জন শিক্ষার্থী। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে ছিল ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৮ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী কমেছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৪৬ জন। এত বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ কী হতে পারে তা নিয়ে ময়মনসিংহ সদর, তারাকান্দা, হালুয়াঘাট ও ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁদের মূল্যায়ন হচ্ছে, অনেক অভিভাবক এখন সন্তানদের মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন কিংবা বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করাচ্ছেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ শুমারি (২০২৪ সালে করা) অনুযায়ী, ২০২০ সালে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৭ শতাংশের বেশি। ২০২৩ সালে তা নেমে আসে ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশে। কিন্তু ২০২৪ সালে ঝরে পড়ার হার আবার বেড়ে যায়। ২০২৪ সালের শুমারির বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেট বিভাগে ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক বেশি। এর মধ্যে ময়মনসিংহ বিভাগের চারটি জেলাতেই ঝরে পড়ার হার ৩০ শতাংশের বেশি। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি গফরগাঁও উপজেলায়, প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এই উপজেলায় ২০২০ সালে শিক্ষার্থী ছিল অনেক বেশি, যা এখন আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।
গফরগাঁও উপজেলার বাতেনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামের মতে, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ অভিভাবকদের সঙ্গে বিদ্যালয়ের যোগাযোগ কমে যাওয়া। ময়মনসিংহ জেলায় প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারে তারাকান্দা উপজেলা দ্বিতীয়। চলতি বছর এই উপজেলায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ৪ শতাংশ। প্রাথমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রভাব স্বাভাবিক কারণেই মাধ্যমিকে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষাবিদরা। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ময়মনসিংহে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৫ লাখ ৪৮ হাজার, ২০২২ সালে তা কমে হয় ৪ লাখ ২৭ হাজার। অবশ্য ২০২৩ সালে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা বেড়ে হয় ৪ লাখ ৫৪ হাজার, কিন্তু ২০২৬ সালে তা আবার বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার সিরতা ইউনিয়নের আনন্দিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সানোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত হোম ভিজিট করে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে কাজ করে যাচ্ছি।’ তবে শিক্ষক–সংকট একটি বড় বাধা। ময়মনসিংহ জেলার ২ হাজার ১৪০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১ হাজার ২৪২টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ প্রায় ৫৮ শতাংশ বিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। জেলায় সহকারী শিক্ষকের পদও অনেক খালি। যেমন সদর উপজেলার পয়েস্তিরচর তারাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয়টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। শিক্ষক–সংকটের কারণে একসঙ্গে দুটি শ্রেণির পাঠদান করতে হচ্ছে। এই বিদ্যালয়ে এখন শিক্ষার্থী ১১২ জন।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহবুবা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, দুজন শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। করোনার সময় অনেক শিক্ষার্থী আশপাশের মাদ্রাসায় চলে যায়, তাদের অনেকেই আর ফিরে আসেনি। গত ৩০ জুলাই বেলা সোয়া ৩টায় ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার ১১৯ নম্বর গোলাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান এই প্রতিবেদক। কিন্তু বিদ্যালয়টি বন্ধ পাওয়া যায়। যদিও বিকেল সোয়া ৪টায় বিদ্যালয় ছুটি হওয়ার কথা। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এই বিদ্যালয়ে মাত্র দুজন শিক্ষক কর্মরত। তবে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৬। ২০১৮ সালে এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বদলি হয়ে যাওয়ার পর থেকে নতুন কেউ যোগ দেননি। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আইয়ুব আলী বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১৫২ জন। ২০১৮ সালে ছিল ২০৪ জন।
গোলাবাড়ী থেকে মোটরসাইকেলে করে আড়াই কিলোমিটার দূরে বিন্নাকুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বেলা ৩টা ৩৫ মিনিটে শিক্ষার্থীদের ছুটি দিয়ে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন শিক্ষকরা। এই বিদ্যালয়ে সাতজন শিক্ষক থাকার কথা, কিন্তু কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। শিক্ষার্থী ১৩৩ জন। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুসরাত আহমেদ বলেন, প্রধান শিক্ষক না থাকায় পাঠদানসহ বিদ্যালয় পরিচালনার পুরো ব্যবস্থার ওপর প্রভাব পড়ছে। সময়ের আগেই বিদ্যালয় ছুটি দেওয়ার বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। অভিভাবকরা বলছেন, মানসম্মত শিক্ষার অভাব এবং শিক্ষকদের অনুপস্থিতি তাদের সন্তানদের অন্য স্কুলে পাঠাতে বাধ্য করছে।
গত ৩০ জুলাই দুপুরে ঝাপারকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণিতে মাত্র ১০ জন শিক্ষার্থী ক্লাস করছে। শিক্ষার্থী উপস্থিতি দিন দিন কমছে উল্লেখ করে সহকারী শিক্ষক সনি ফারজানা প্রথম আলোকে বলেন, টিনের ঘরে শিক্ষার্থীরা গরমে ক্লাস করতে পারে না। নদীভাঙনে বিদ্যালয়ের ভবন বিলীন হওয়ার পর ২০১৯ সালে নির্মিত টিনশেড ভবনে পাঠদান চলছে। ২০১৭ সালে বিদ্যালয়টিতে ২৪০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও বর্তমানে তা কমে ১০৭ জনে দাঁড়িয়েছে। অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবেশে পড়াতে চান, যা সরকারি অনেক স্কুলে নেই।
শফিকুল ইসলাম নামের এক অভিভাবক প্রথম আলোকে বলেন, ‘অভিভাবকদের একটি বড় অংশ এখন সন্তানদের মাদ্রাসা, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন কিংবা বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করাচ্ছেন।’ তিনি আরও বলেন, সরকারি স্কুলে পড়াশোনার মান নিয়ে তাদের মনে প্রশ্ন রয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আরও বলেন, কেউ যদি মনে করেন সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যম বা কিন্ডারগার্টেনে পড়াবেন, কিংবা মাদ্রাসায় পড়াবেন, সেটি তাঁদের সিদ্ধান্ত। তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার কাজ করছে বলে তিনি দাবি করেন।
শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার এই প্রবণতা কেবল একটি উপজেলার সমস্যা নয়, বরং পুরো ময়মনসিংহ জেলার একটি সামগ্রিক চিত্র। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও নদীভাঙন কবলিত এলাকায় এই হার আরও বেশি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যালয়ের ভবন জরাজীর্ণ হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা সেখানে যেতে অনাগ্রহী। আবার অনেক জায়গায় শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত ক্লাস হয় না। ফলে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছেন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় শিক্ষা অফিসগুলো বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
পরিশেষে, ময়মনসিংহের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় যে ধস নেমেছে, তা রোধ করতে হলে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করা জরুরি। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনার জন্য বিশেষ প্রণোদনা বা সচেতনতামূলক কার্যক্রমের প্রয়োজন রয়েছে। অন্যথায়, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিক্ষা বিভাগকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে যাতে প্রতিটি শিশু মানসম্মত শিক্ষা পায় এবং ঝরে পড়ার হার শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
কিন্তু ২০২৪ সালে ঝরে পড়ার হার আবার বেড়ে হয় ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।
এই উপজেলায় ২০২০ সালে শিক্ষার্থী ছিল ৬০ হাজার ৮১৫ জন।
অবশ্য ২০২৩ সালে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা বেড়ে হয় ৪ লাখ ৬৯ হাজার, ২০২৪ সালে ৪ লাখ ৬৬ হাজার এবং ২০২৫ সালে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বেড়ে হয় ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৮।
জেলায় সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১১ হাজার ৯০২টি।
এর মধ্যে কর্মরত আছেন ১১ হাজার ৪৯ জন।
গত ৩০ জুলাই বিকেলে তাঁকে বিদ্যালয়ে পাওয়া যায়নি।
শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়টি অবশ্যই আমাদের জন্য উদ্বেগের।
তবে অভিভাবকদেরও নিজস্ব পছন্দ ও অগ্রাধিকার রয়েছে।’
করোনা-পরবর্তী সময় থেকেই এ প্রবণতা কিছুটা বেড়েছে।
সূত্র: প্রথম আলো













