প্রতিনিধি 31 August 2026 , 9:51:29 প্রিন্ট সংস্করণ

রবীন্দ্রসংগীতাচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদারের স্মৃতিবিজড়িত নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের বাহাম গ্রামে নির্মিত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি বর্তমানে চরম অবহেলা ও অচল অবস্থায় পড়ে আছে। প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিশাল স্থাপনাটি এখন তালাবদ্ধ। ১৯০০ সালের ১৯ জুলাই এই গ্রামেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন রবীন্দ্রসংগীতের বিশিষ্ট সাধক, শিক্ষক ও স্বরলিপিকার শৈলজারঞ্জন মজুমদার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে ‘গীতাম্বুধি’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। বিশ্বভারতী ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ও তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেছিল।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর শ্যামলী কাব্যগ্রন্থের ‘উৎসর্গ’ কবিতায় নেত্রকোনার উল্লেখ করেছিলেন, যদিও তিনি নিজে কখনো সেখানে যাননি। এই জনপদের সঙ্গে তাঁর সংযোগ ছিল শৈলজারঞ্জন মজুমদারের মাধ্যমেই। সেই শৈলজারঞ্জনের জন্মভিটায় নির্মিত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি উদ্বোধনের তিন বছরের মাথায় এখন প্রাণহীন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কেন্দ্রটিতে ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়।
সোয়া দুই একর জমির ওপর নির্মিত এই কেন্দ্রটির প্রধান ফটক ২৫ আগস্ট বেলা ১১টার দিকেও বন্ধ পাওয়া যায়। পরে মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুনের সহায়তায় মোহাম্মদ সামিউজ্জামান নামের এক টেকনিশিয়ান এসে ফটক খোলেন। বর্তমানে তিনিই কেন্দ্রটির সার্বিক দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিনের অযত্নে কেন্দ্রের ভেতরে হাঁটার পথ ও খোলা জায়গা লতাপাতায় ঢেকে গেছে। ভবনের গ্রন্থাগার ও মহড়া কক্ষের ছাদের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লুটপাটের শিকার কেন্দ্রটির অনেক সরঞ্জাম এখন আর নেই। অকেজো হয়ে পড়েছে লিফট, ৫টি এসি এবং অন্তত ৫৩টি বাতি। গত ৫ আগস্টের পর থেকে বৈদ্যুতিক পাখা, চেয়ার-টেবিল, ঝাড়বাতি, সিসিটিভি ক্যামেরা, সাউন্ড বক্স, আইপিএস, কম্পিউটার, মনিটর, বাদ্যযন্ত্র, বজ্রনিরোধক যন্ত্র ও অডিটোরিয়ামের কন্ট্রোল বক্সসহ বিভিন্ন মূল্যবান আসবাব ও সরঞ্জাম খোয়া গেছে। যদিও স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে কিছু মালামাল পরে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে গণপূর্ত বিভাগ ২০১৮ সালের ২ নভেম্বর এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে প্রায় ৩৫ কোটি ১৫ লাখ, ভূমি অধিগ্রহণে ৫ কোটি এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণে ১০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। ২০২৩ সালের ১১ মার্চ কেন্দ্রটির কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এখানে রবীন্দ্রসংগীতের প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং লোকসংস্কৃতি চর্চার কথা থাকলেও উদ্বোধনের পর মাত্র এক বছরে হাতেগোনা কয়েকটি অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছে।
নেত্রকোনা জেলা উদীচীর সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান কেবল ভবন বা মিলনায়তন দিয়ে প্রাণ পায় না; এর জন্য নিয়মিত অনুষ্ঠান, গবেষণা ও শিল্পীদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। কিন্তু এখানে সেই প্রাণের অভাব স্পষ্ট। মদন উপজেলা থেকে আসা সংস্কৃতিকর্মী মো. সানোয়ারুজ্জামানও এত বড় স্থাপনায় কোনো কার্যক্রম না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন।
পরিচালনা কমিটির ২১ সদস্যের একটি প্যানেল থাকলেও গত তিন বছরে কোনো সভাই অনুষ্ঠিত হয়নি। কমিটির এক সদস্য জানান, কার্যক্রম না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি সচল করার কোনো উদ্যোগই দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে কেন্দ্রটিতে ৩৪টি পদের বিপরীতে মাত্র দুজন কর্মী কর্মরত আছেন—টেকনিশিয়ান মোহাম্মদ সামিউজ্জামান ইমন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী জয় হরিচরণ। তাঁদের বেতন-ভাতাসহ বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খাতে মাসে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হয়।
ইউএনও জানান, কেন্দ্রটির নিজস্ব তহবিলে প্রায় এক কোটি টাকা জমা রয়েছে। নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটি কীভাবে পুনরায় সচল করা যায়, তা নিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জীবনীগ্রন্থের প্রণেতা সঞ্জয় সরকার বলেন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এই কেন্দ্র নির্মাণ করায় আমরা আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতায় এটি এখন অচলায়তনে পরিণত হয়েছে। তিনি অবিলম্বে প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দিয়ে কেন্দ্রটি সচল করার দাবি জানান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চেয়ে দেখে দেখে জানালার নাম রেখেছি—“নেত্রকোণা”।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সব মিলিয়ে অঙ্ক দাঁড়ায় ৫০ কোটি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সানোয়ারুজ্জামান বলেন, এত টাকা খরচ করে এত সুন্দর স্থাপনা হলো; কিন্তু এখানে কোনো অনুষ্ঠান হয় না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ‘বেড়ার ওপারে মৌসুমি ফুলে রঙের স্বপ্ন বোনা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অথচ তিনি কোনো দিন নেত্রকোনায় আসেননি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর কিছুক্ষণ পর মোহাম্মদ সামিউজ্জামান নামের এক ব্যক্তি এসে ফটকের তালা খুলে দেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ ব্যাপারে পরিচালনা কমিটির যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘কমিটিতে আমাকে রাখা হয়েছে; কিন্তু গত তিন বছরে একটি সভাও আহ্বান করা হয়নি।
সূত্র: প্রথম আলো












