বিশ্ব

মাত্র ৫.৩ সেকেন্ডে ৮০০ কিমি গতি: নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়ল চীনের ম্যাগলেভ ট্রেন

  প্রতিনিধি 14 August 2026 , 9:29:29 প্রিন্ট সংস্করণ

চীনের হুবেই প্রদেশের দুংহু ল্যাবরেটরিতে একটি পরীক্ষামূলক ম্যাগলেভ বুলেট ট্রেন নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে। মাত্র এক কিলোমিটার দীর্ঘ ট্র্যাকে ট্রেনটি স্থির অবস্থা থেকে মাত্র ৫ দশমিক ৩ সেকেন্ডে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতি অর্জন করেছে। এই অভাবনীয় সাফল্য উচ্চগতির পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ম্যাগলেভ প্রযুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য হলো চৌম্বক শক্তির সাহায্যে ট্রেনটিকে রেললাইনের সামান্য ওপরে ভাসিয়ে রাখা। এর ফলে ট্রেনের সঙ্গে লাইনের কোনো ঘর্ষণ হয় না এবং লাইনের চারপাশে থাকা কয়েলের মাধ্যমে তৈরি চৌম্বক তরঙ্গ ট্রেনটিকে তীব্র গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়। গবেষকরা প্রমাণ করেছেন যে, এই অতি উচ্চগতিতে চলার পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় ব্রেকিং সিস্টেমের মাধ্যমে ট্রেনটিকে নিরাপদে এবং মসৃণভাবে থামানোও সম্ভব। পরীক্ষা শেষে মাত্র ২০০ মিটারের ব্যবধানে ট্রেনটি সম্পূর্ণ স্থির অবস্থায় ফিরে আসে।

১ দশমিক ১ টন ওজনের এই ট্রেনটি নিয়ে গত ছয় মাসে এটি তৃতীয়বারের মতো রেকর্ড গড়ার ঘটনা। ২০২৫ সালের জুন মাসে প্রথম পরীক্ষায় এটি সাত সেকেন্ডে ঘণ্টায় ৬৫০ কিলোমিটার গতি তুলেছিল। এরপর ধাপে ধাপে গতি বৃদ্ধির সময় কমিয়ে ট্রেনটি ঘণ্টায় ৭০০ কিলোমিটার এবং পরবর্তীতে ৭৯৮ কিলোমিটার গতি অর্জন করে নিজেদের রেকর্ড নিজেরাই ভেঙেছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির তথ্যমতে, এই পরীক্ষামূলক চালনাগুলোর মাধ্যমে উচ্চক্ষমতার বিদ্যুৎ সরবরাহ, তড়িৎ-চৌম্বকীয় প্রপালশন, উচ্চগতির লেভিটেশন নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি ব্রেক ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে। বর্তমানে চীন ও জাপানে চলাচলকারী ম্যাগলেভ ট্রেনগুলো সাধারণত ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার গতিতে চলে এবং চীনের দ্রুততম বাণিজ্যিক ট্রেন ‘ফুক্সিং’-এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটার।

এই গবেষণার পাশাপাশি চীনের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ডিফেন্স টেকনোলজির গবেষকরাও অতি উচ্চগতির ম্যাগলেভ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। তাদের একটি পরীক্ষায় ট্রেনটি মাত্র দুই সেকেন্ডে ঘণ্টায় ৬৯৭ কিলোমিটার গতি তুলতে সক্ষম হয়েছে। যদিও বর্তমানের এই পরীক্ষামূলক ট্রেনটি যাত্রী পরিবহনের উপযোগী নয়, তবে গবেষকদের প্রত্যাশা, এর মূল নীতিগুলো ভবিষ্যতে রকেট বা যুদ্ধবিমান উৎক্ষেপণ ব্যবস্থার উন্নয়নে সহায়ক হবে।

বিজ্ঞানীরা বর্তমানে বায়ুশূন্য টিউবের ভেতর ট্রেন চালানোর মতো অতি উচ্চগতির ম্যাগলেভ প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করছেন। তবে এই ধরনের প্রযুক্তির বাণিজ্যিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত বিশাল ব্যয়, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘ দূরত্বজুড়ে নিখুঁত ট্র্যাক নির্মাণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

শূন্য থেকে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতিতে ছুটে যাওয়ার পর ট্রেনটি মাত্র ২০০ মিটারের ব্যবধানে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ মসৃণভাবে থেমে যায়।

পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে ম্যাগলেভ ট্রেনটি গতি বৃদ্ধির সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনে যথাক্রমে ঘণ্টায় প্রায় ৭০০ কিলোমিটার ও ৭৯৮ কিলোমিটার গতি অর্জন করে নিজের রেকর্ড নিজেই ভাঙে।

অন্যদিকে, বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির বাণিজ্যিক ম্যাগলেভ ট্রেন হলো চীনের ‘ফুক্সিং’, যার সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটার।

ঠিক এ মুহূর্তে এ প্রযুক্তির ট্রেনটি মানুষের যাতায়াতের উপযোগী না হলেও গবেষকদের আশা, এর মূল নীতিগুলো একসময় রকেট ও ফাইটার জেট বা যুদ্ধবিমান উৎক্ষেপণব্যবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content