রাজনীতি

২৪ ঘণ্টায় নাটকীয় মোড়: ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন সমীকরণ

  প্রতিনিধি 8 August 2026 , 12:43:33 প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে একটি বিশেষ বিবৃতি সব হিসাব-নিকাশ ও রাজনৈতিক নকশা পাল্টে দিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দুদেশের সম্পর্কে যে হিমশীতল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছে উভয় পক্ষ। বিশেষ করে দিল্লির রাজনৈতিক কৌশল ঢাকাকে স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ করেছিল, যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ সরকার একটি কঠোর কূটনৈতিক বিবৃতি প্রদান করে। এই বিবৃতির ভাষা ছিল প্রথাগত কূটনীতির বাইরে এবং অত্যন্ত স্পষ্ট। বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সরকারি মদতে সংবাদ সম্মেলন করতে পারেন না। যদিও দিল্লির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাবের কর্মকাণ্ডে তাদের কোনো হাত নেই, কিন্তু বাস্তবে পুরো আয়োজনটি ভারতীয় সাংবাদিকদের আধিপত্যে পরিচালিত হওয়ায় ঢাকার ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পায়।

এই খবর ঢাকায় পৌঁছানোর পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতিটি দিক পর্যালোচনা করেন। শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে একটি রাজনৈতিক বিবৃতি প্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার মাধ্যমে ঢাকার অবস্থান বিশ্বমঞ্চে পরিষ্কার করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশ গভীরভাবে ক্ষুব্ধ। জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপনের দিনে ভারতীয় ভূখণ্ডে তার এই মতবিনিময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত এবং শহীদদের প্রতি চরম অপমান হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে জানিয়েছে, তারা আর কখনো ফ্যাসিবাদের অন্ধকার সময়ে ফিরে যাবে না এবং তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।

বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। তবে পরিতাপের বিষয় হলো, ২০১৩ সালের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য বারবার অনুরোধ জানানো হলেও ভারত এখনো কোনো সাড়া দেয়নি। বরং তাকে প্রকাশ্যে গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়া দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। এই বিবৃতি প্রকাশের পর দিল্লিতে উচ্চপর্যায়ে নড়েচড়ে বসার খবর পাওয়া গেছে। উল্লেখ্য যে, বেশ কিছুকাল যাবত দিল্লির বিদেশ মন্ত্রণালয় সরাসরি বাংলাদেশ বিষয় সামলায় না, বরং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এটি সমন্বয় করেন। বাংলাদেশের আপত্তির বিষয়টি তাদের জানানো হয়েছিল এবং সম্পর্কের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল।

বিবৃতি প্রদানের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয় এবং ঢাকা নতুন বার্তা পায়। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, দিল্লির বিদেশ মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা খুব শিগগিরই একটি বিশেষ পত্র নিয়ে ঢাকা আসছেন। ওই পত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের তাগিদ থাকবে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের আমন্ত্রণও থাকতে পারে। যদিও প্রধানমন্ত্রী ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন না বলে প্রায় নিশ্চিত হওয়া গেছে। একইসঙ্গে হাসিনার তৎপরতার সঙ্গে ঢাকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তাপের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের অনুষ্ঠান বয়কট ও কিছু মহলের বিতর্কিত রাজনৈতিক ছক তৈরির বিষয়টিও পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে, যেখানে বিদেশি কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগের ঘটনাটি দুর্ভাগ্যজনক ছিল।

আগামী ১০ই আগস্ট ঢাকায় অবস্থানরত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। ঢাকায় আসার পর এটিই হবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাৎ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই সাক্ষাতের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। রাজনীতিক কাম কূটনীতিক দীনেশ ত্রিবেদী মন্ত্রী পদমর্যাদায় হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করছেন। এই বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝির অবসান এবং নতুন করে সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার এই নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ আগামী দিনগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content