প্রতিনিধি 23 August 2026 , 12:17:13 প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭২ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় একটি ছোট সরিষার তেলের মিল দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল সিটি গ্রুপ। সময়ের পরিক্রমায় ভোগ্যপণ্য, ইস্পাত, শিপিং, চা ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানের মৃত্যুর পর এবং ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে গ্রুপটি এখন নজিরবিহীন আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। বর্তমানে গ্রুপটির হাল ধরেছেন ফজলুর রহমানের ছেলে ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান।

তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সখ্যতাকে কাজে লাগিয়ে গত দেড় দশকে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সিটি গ্রুপ। অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের অপকর্ম আড়াল করতে এবং প্রশাসনিক প্রভাব বজায় রাখতে তারা গণমাধ্যমকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ক্ষমতার পালাবদলের পর ব্যাংকগুলো থেকে নতুন সুবিধা পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং আগের নেওয়া ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় গ্রুপটি চরম তারল্য সংকটে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারেরও অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত সিটি গ্রুপের দেশি-বিদেশি ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে এইচএসবিসি’র পাওনা প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংক পিএলসি’র ১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা, ইউসিবি’র ১ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংকের ১ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা এবং ব্র্যাক ব্যাংকের ৯৮৬ কোটি টাকা।
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় ১০৮.৫৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে ছয়টি শিল্প প্রকল্পে অপরিকল্পিত বিনিয়োগের কারণে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা আটকে গেছে। এই বিনিয়োগ থেকে কোনো আয় না আসলেও ঋণের সুদ ক্রমাগত বাড়ছে। সিটি গ্রুপ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। এছাড়া ২০২২ সালে বিনিময় হারের বড় পরিবর্তনের কারণেও গ্রুপটি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে গ্রুপটি তাদের সম্পদ বিক্রির পরিকল্পনা করছে। হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কয়েকটি বিক্রির বিষয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের অংশ হিসেবে মালিকানাধীন ১৮ হাজার ৮৭৫ একর আয়তনের আটটি চা বাগানের আংশিক বিক্রির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তবে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ভঙ্গুর ঋণ কাঠামোর মধ্যে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা উত্তোলনের উদ্যোগ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন ঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, কোনো বড় শিল্প গ্রুপ খেলাপি হওয়া দেশের অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা। তিনি বলেন, আইন মেনে নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা দেওয়ার চেষ্টা করবে। তবে ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞরা বলছেন, অতীতে একাধিক ব্যাংক মিলে কোনো গ্রুপকে উদ্ধারের চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে চাটুকারিতার সেই সাম্রাজ্যে এখন ধস নেমেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অন্যদিকে আগের নেয়া খেলাপি ঋণ ও সুদের পাহাড় সিটি গ্রুপকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। চাকরির আরও তথ্য: এর ফলে প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ অলস পড়ে রয়েছে, অথচ এর বিপরীতে অর্থায়নের খরচ বা সুদ ক্রমাগত জমা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যখন কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক খাতকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে, তার পরিণতি এমনই হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একটি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ব্যাংকগুলো কতোটুকু ঋণ আদায় করতে পারবে তা নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আমরা চার-পাঁচটি ব্যাংক মিলে কাউকে উদ্ধার (সালভেজ) করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সফল হতে পারিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভোজ্য তেল, আটা-ময়দা, চিনি, ডাল, চাল, ফিডসহ অন্যান্য ভোগ্য ও শিল্প পণ্যের ব্যবসা রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তীর, বেঙ্গল, ন্যাচারাল, জীবন, কুইক বাইট ও জেলফি সিটি গ্রুপের অন্যতম ব্র্যান্ড।
সূত্র: মানবজমিন



















