প্রতিনিধি 6 August 2026 , 9:54:12 প্রিন্ট সংস্করণ

সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ তৈরির ক্ষেত্রে জুলাই জাতীয় সনদের পাশাপাশি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারকেও ধারণ করবে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। প্রথম বৈঠক শেষে কমিটির পক্ষ থেকে গত মঙ্গলবার এ কথা জানানো হয়। সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত বিষয়ে এই দুই গুরুত্বপূর্ণ নথির সমন্বয় কীভাবে হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশেষ কমিটি জানিয়েছে, তারা কোনো একটিকে এককভাবে প্রাধান্য না দিয়ে উভয় নথির প্রস্তাবনাগুলো পর্যালোচনা করে একটি সমন্বিত রূপরেখা তৈরির চেষ্টা করবে।

সংবিধান সংস্কারের আলোচনা শুরু হয়েছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর একটি ছিল অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন সংবিধান সংস্কার কমিশন। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা, জনমত জরিপসহ বিভিন্নভাবে নেওয়া মতামতের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি ওই কমিশন বিস্তারিত সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দেয়। এই সুপারিশগুলোই পরবর্তীতে জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
জুলাই জাতীয় সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সরাসরি সংবিধান-সম্পর্কিত। এর মধ্যে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, উচ্চকক্ষের ক্ষমতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপদ্ধতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধানসহ এ ধরনের কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন আসবে। এই সনদটি সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঘোষিত বিএনপির ইশতেহারের প্রথম অধ্যায়ের শিরোনাম ‘রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার’। এই অধ্যায়ের একটি অংশে ‘সাংবিধানিক সংস্কার’ শিরোনামে ৩৫টি প্রস্তাব রয়েছে। এসব প্রস্তাবের কয়েকটি জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন ও কৌশলগত অবস্থানের প্রতিফলন রয়েছে। বিএনপি তাদের ইশতেহারে বলেছে, ‘রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে ৩১ দফার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার সাধন করা হবে।’
বিএনপি তাদের ইশতেহারে বলেছে, ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করা হবে। বিএনপি সকল বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক সাংবিধানিক সংশোধনী ও বিধানাবলি পর্যালোচনা ও পুনঃপরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কারের অঙ্গীকার করেছে। দলটির মতে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এবং স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে একটি “নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার” ব্যবস্থা প্রবর্তন করা অপরিহার্য। তবে বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বাইরে রাখতে চায় বিএনপি।’
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় সব কটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে একমত হয়েছিল। কিন্তু এ সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া কেমন হবে—তা নিয়ে মতভিন্নতা ছিল। জুলাই সনদের প্রস্তাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে বেশ কয়েকটি স্তরের কথা বলা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতাসহ ৫ সদস্যের একটি সংসদীয় কমিটি ‘তত্ত্ববধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাছাই কমিটি’ হিসেবে কাজ করবে। এই কমিটি গঠনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিবন্ধিত দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টা পদে উপযুক্ত একজন করে ব্যক্তির নাম দিতে পারবে। পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কমিটি এ তালিকা থেকে একজনকে বাছাই করবে। অথবা কোনো একজনের বিষয়ে ৫ সদস্যের কমিটির ৪ জন একমত হলে তিনি হবেন প্রধান উপদেষ্টা।
এই পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা বাছাই করা সম্ভব না হলে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরকারি দল/জোট এবং প্রধান বিরোধী দল/জোট ৫ জন করে এবং সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল ২ জন ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করবে। সরকারি দলের তালিকা থেকে বিরোধী দল একজনকে এবং বিরোধী দলের তালিকা থেকে সরকারি দল একজনকে বাছাই করবে। এই পদ্ধতিতেও প্রধান উপদেষ্টা বাছাই করা সম্ভব না হলে বিচার বিভাগের দুজন প্রতিনিধি বাছাই কমিটিতে যুক্ত হবেন। তবে এই স্তরটি নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত ছিল। তারা এই স্তরটি জাতীয় সংসদের মাধ্যমে নির্ধারণ করার পক্ষে মত দেয়।
বিএনপি তাদের ইশতেহারে বলেছে, ‘একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে যত মেয়াদ বা যত বারই হোক, তিনি সর্বোচ্চ ১০ বছর অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদেও অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন।’ ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা হবে।’ এছাড়া উচ্চকক্ষ কোনো বিল সর্বোচ্চ ২ মাসের বেশি আটকে রাখলে তা উচ্চকক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত বলে বিবেচিত হবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠনের জন্য এবং মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) পদে নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে। পিএসসিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সাধারণ (অন্য সকল সেক্টরে) নিয়োগের জন্য যথোপযুক্ত শক্তিশালী কাঠামোতে রূপান্তর করা হবে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ আইনানুসারে সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন বলে ইশতেহারে স্পষ্ট করা হয়েছে।
অন্যদিকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ক্ষমতার ভারসাম্য আনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সাংবিধানিক পদে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানোর লক্ষ্যে এসব পদে নিয়োগের বিধান সংবিধানে যুক্ত করা এবং কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে ছিল। জুলাই সনদেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। ক্ষমতা বাড়াতে ছয়টি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয় জুলাই সনদে। সেগুলো হলো জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, তথ্য কমিশনের প্রধান ও কমিশনার, প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্য, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, নির্বাচন কমিশন এবং পিএসসি।
জুলাই জাতীয় সনদ ও বিএনপির ইশতেহার উভয় জায়গাতেই আইনসভাকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করার কথা বলা আছে। তবে উচ্চকক্ষের গঠনপ্রক্রিয়া ও ক্ষমতা নিয়ে সনদের প্রস্তাব এবং বিএনপির ইশতেহারের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ কমিটি এখন এই পার্থক্যগুলো দূর করে একটি ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। আইনমন্ত্রী কমিটির বৈঠক শেষে জানিয়েছেন, জুলাই সনদেই অনেক বিষয়ের ব্যাখ্যা দেওয়া আছে এবং সেটিই সংস্কারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের ভিত্তিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে ওই গণভোট আয়োজন করা হয়েছিল, যা এই সংস্কার প্রক্রিয়ার আইনি বৈধতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘সংবিধানের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগিতার লক্ষ্যে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, রাষ্ট
উচ্চকক্ষ কোনো বিল সর্বোচ্চ ১ মাসের বেশি আটকে রাখলে তা উচ্চকক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত বলে বিবেচিত হবে।’
বিএনপি তাদের ইশতেহারের সাংবিধানিক সংস্কারের প্রথম দফায় বলেছিল, ‘সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিগত ১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া
বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘সংবিধানের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগিতার লক্ষ্যে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি ও অন্যান্য পেশাজীবীদের সমন্বয়ে সংসদে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ প্রবর্তন করা হবে।
রাজনৈতিক দলসমূহ নিম্নকক্ষের অর্জিত আসন সংখ্যার আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবে।’
এটি হলে একটি দল সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে যত ভোট পাবে তার অনুপাতে উচ্চকক্ষের আসন পাবে।
নিম্নকক্ষে পাস হওয়া অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া সব বিল উচ্চকক্ষে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করতে হবে।
বিএনপি তাদের ইশতেহারের সাংবিধানিক সংস্কারের প্রথম দফায় বলেছিল, ‘সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিগত ১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’
কারণ, জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলোর পাশে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত অংশে একটি নোট আছে।
যেখানে বলা আছে, ‘অবশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনে ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তাহলে তারা সেই মতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।’
এর অর্থ জুলাই সনদের মূল প্রস্তাবগুলোর ওপরই গণভোট হয়েছে।
অবশ্য এখন বিএনপি বলছে, ওই আদেশ অবৈধ।
কোনো জায়গায় যদি বিএনপি দ্বিমত পোষণ করে থাকে এবং সেই দ্বিমতের আলোকে যদি তার নির্বাচনী ইশতেহার অন্তর্ভুক্ত করা থাকে, তাহলে সেইটা প্রিভেইল করবে।
সেটাও কিন্তু জুলাই সনদেরই অংশ।’ আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমার কোনটা মানা উচিত সেটা জুলাই সনদেই বলে দেওয়া আছে।
এখানে ভিন্ন ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।’
সূত্র: প্রথম আলো



















