আইন-আদালত

লুট হওয়া অস্ত্র ও পলাতক বন্দীদের নিয়ে উদ্বেগ: উদ্ধার অভিযানে ধীরগতি

  প্রতিনিধি 7 August 2026 , 2:44:24 প্রিন্ট সংস্করণ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশি স্থাপনায় ব্যাপক হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই অস্থির সময়ে মোট ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদ লুট হয়। এসব অস্ত্রের মধ্যে রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি, পিস্তল, শটগান ও বিভিন্ন ধরনের গ্রেনেডসহ বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম রয়েছে। গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া যৌথ অভিযানে চলতি বছরের ৫ জুলাই পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৪৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৯টি গোলাবারুদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ, এখনো ১ হাজার ৩১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৩৯টি গোলাবারুদ উদ্ধার করা বাকি রয়েছে।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের সিংগারপুরে মাছ ধরার সময় জেলের জালে একটি শটগান আটকা পড়ে। পরে রেজিস্টার যাচাই করে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, এটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আড়াইহাজার থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, লুট হওয়া অস্ত্রগুলো এখনো বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এবং অপরাধীদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব অস্ত্র ব্যবহার করে খুন, ডাকাতি ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এমনকি লুট হওয়া অস্ত্র বিক্রির সঙ্গে পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের জড়িত থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।

কারাগারের পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, সরকার পতনের আগে ও পরে দেশের বিভিন্ন কারাগারে বিশৃঙ্খলার সুযোগে ২ হাজার ২৪০ জন বন্দী পালিয়ে যান। কারা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এখনো ৬৮৩ জন বন্দী পলাতক রয়েছেন। কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানিয়েছেন, পলাতক বন্দীদের মধ্যে ৬৯ জন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যার মধ্যে ৬০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এবং ৯ জন জঙ্গি। এছাড়া কারাগার থেকে লুট হওয়া ২০টি শটগান ও চায়নিজ রাইফেল এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

লুট হওয়া অস্ত্রের অপব্যবহারের বেশ কিছু নজির সামনে এসেছে। গত বছরের ৩ মার্চ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় গণপিটুনিতে নেজাম উদ্দিনসহ দুজনের মৃত্যুর পর ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়, যা কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হয়েছিল। ওই ঘটনায় চাঁদপুরে কর্মরত পুলিশ কনস্টেবল মো. রিয়াদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। ২১ মার্চ কনস্টেবল রিয়াদসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে লোহাগাড়া থানা থেকে লুট হওয়া একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। রিয়াদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।

চট্টগ্রামেই আরেকটি ঘটনায় ১৯ জুন সাইদুর রহমান মাসুম ওরফে রেড মাসুম নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মাসুম নগরীর একটি বড় সন্ত্রাসী চক্রের প্রধান হিসেবে পরিচিত। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা পিস্তলটি পাহাড়তলী থানা থেকে লুট করা হয়েছিল। এই অস্ত্র ব্যবহার করে সে ও তার সহযোগীরা ছিনতাই ও ডাকাতিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাত। এ ধরনের আরও অনেক সন্ত্রাসী ও অপরাধীকে থানা থেকে লুট করা অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।

সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ধীরগতিতে হলেও নিয়মিত বিরতিতে কিছু অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। তিনি মনে করেন না যে, এই পরিস্থিতির কারণে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি ঘটবে।

কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, র‍্যাব ও পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালিয়ে পলাতক সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের গ্রেপ্তার করছে। কারাগারের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো বড় ধরনের ঝুঁকি নেই বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন। তবে লুট হওয়া অস্ত্র ও পলাতক বন্দীদের বিষয়টি এখনো জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে, কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া কয়েক শ বন্দীকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি, সেই বিষয়ও।

পালানো বন্দীদের মধ্যে ৬৮৩ জনকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি।

মোতাহের হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ধরা না পড়া বন্দীদের মধ্যে ৬৯ জন ঝুঁকিপূর্ণ।

লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র-গোলাবারুদের মধ্যে আছে বিভিন্ন ধরনের রাইফেল, এসএমজি (স্মল মেশিনগান), এলএমজি (লাইট মেশিনগান), পিস্তল, শটগান, গ্যাসগান, কাঁদানে গ্যাস লঞ্চার, কাঁদানে গ্যাসের শেল, কাঁদানে গ্যাসের স্প্রে, সাউন্ড গ্রেনেড, কালার স্মোক গ্রেনেড, ব্যাং গ্রেনেড, হ্যান্ডহেল্ড টিয়ার গ্যাস স্প্রে ও বিভিন্ন বোরের গুলি।

হত্যার আগে ওই পিস্তল দিয়ে গুলি ছুড়েছিলেন নিহত ব্যক্তিদের একজন, তাঁর নাম নেজাম উদ্দিন।

এতে স্থানীয় এক দোকানিসহ চারজন গুলিবিদ্ধ হন।

পরে তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সুপার (এসপি) নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ঘটনার দিন নেজাম সেখানে গিয়ে অস্ত্র নিয়ে গুলি করেছিলেন।

ওই সূত্র ধরে ২১ মার্চ কনস্টেবল রিয়াদসহ ছয়জনকে নগরের পতেঙ্গা ও বাকলিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

একই বছরের ১৯ জুন চট্টগ্রামের জেলেপাড়া রানী রাশমণিঘাট এলাকা থেকে সাইদুর রহমান মাসুম ওরফে রেড মাসুম (২৮) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এ ছাড়া থানা থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে খুনখারাবি ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগে পুলিশ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে।

Facebook Comments Box

আরও খবর

Sponsered content