প্রতিনিধি 9 August 2026 , 7:50:32 প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের বাণিজ্য খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। বর্তমানে দেশের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ১৯ শতাংশ এবং আমদানির ১৩ দশমিক ১ শতাংশ সম্পন্ন হচ্ছে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যাদের অধীনে ৭০টি শাখা ও ৫টি উপশাখা রয়েছে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে এইচএসবিসি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। এছাড়া সিটি ব্যাংক এনএ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, উরি ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ও ব্যাংক আলফালাহ এই তালিকায় রয়েছে।

আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংকগুলো বেশ স্থিতিশীল অবস্থানে থাকলেও পুরো ব্যাংকিং খাতের তুলনায় তাদের বাজার হিস্যা কিছুটা কমেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে আমানতের পরিমাণ ছিল ৮৭ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সামান্য বেড়ে ৮৭ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। তবে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে তাদের আমানতের অংশ ২০২৪ সালের ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালে ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে।
আমানতের ধরনে দেশি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে বড় পার্থক্য বিদ্যমান। দেশের ব্যাংকগুলোতে উচ্চ সুদের স্থায়ী আমানতের হার ৪৮ শতাংশ হলেও বিদেশি ব্যাংকগুলোতে তা মাত্র ১৬ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের ৩৯ শতাংশ আসে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে, যা তুলনামূলক কম খরচের। এছাড়া তাদের মোট আমানতের ১৭ শতাংশ রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট (আরএফসিডি), যেখানে দেশি ব্যাংকগুলোতে এই হার মাত্র ২ শতাংশ। মূলত করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এসব ব্যাংকের তহবিল সংগ্রহের খরচও কম থাকে।
ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে সংকোচন লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তাদের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৫১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ৪৬ হাজার ১২২ কোটি টাকায় নেমে আসে। ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতে তাদের ঋণের হিস্যা ৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে রপ্তানি বিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে; ২০২৪ সালের শেষ ছয় মাসে ৩৭৩ কোটি ডলারের রপ্তানি বিল সংগ্রহ করলেও ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বেড়ে ৪১২ কোটি ডলারে পৌঁছায়। আমদানির ক্ষেত্রেও একই সময়ে বিল পরিশোধের পরিমাণ ৩৮৭ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৪২৯ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে তাদের অবদান মাত্র দশমিক ৩ শতাংশ।
মুনাফার দিক থেকে ২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে বেড়ে ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। মুনাফা বিদেশে পাঠানোর পরিমাণও বেড়েছে; ২০২৪ সালের শেষ ছয় মাসে ৫৭৭ কোটি টাকা পাঠানো হলেও ২০২৫ সালের একই সময়ে তা ১ হাজার ৩১৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবে ডলার সংকটের কারণে আগের বকেয়া মুনাফাও গত বছর পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
ব্যক্তিগতভাবে ব্যাংকগুলোর মুনাফায় মিশ্র প্রভাব পড়েছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা আগের বছর ছিল ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এইচএসবিসির মুনাফা ২৩ শতাংশ কমে ৮২৩ কোটি টাকায় নেমেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ১ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। এছাড়া কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন ৫৭৬ কোটি, সিটি ব্যাংক এনএ ৩২৮ কোটি, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ২০৭ কোটি এবং হাবিব ব্যাংক ১৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, বিশ্বাস ও সেবার মানের কারণে কম সুদ পেলেও গ্রাহকরা বিদেশি ব্যাংকের দিকে ঝুঁকছেন। বৈশ্বিক সেবা ও করপোরেট গ্রাহকদের আস্থার কারণে এসব ব্যাংক ভালো করছে। পাশাপাশি তারা এসএমই ও ক্ষুদ্র খাতেও অর্থায়ন করছে, যা দেশি ব্যাংকগুলোর জন্য একটি শিক্ষণীয় মডেল হিসেবে কাজ করছে।
দেশের ব্যাংকগুলোর এমন আমানতের হার ২৯ শতাংশ।
দেশের রপ্তানি আয়ে তাদের অংশ এখন ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন ২০২৫ সালে মুনাফা করে ৫৭৬ কোটি টাকা, ২০২৪ সালে যা ছিল ৬০০ কোটি টাকা।
যদিও বিদায়ী বছরে আমানত বেড়েছে অল্পই।
এদিকে দেশের অর্থনীতির মন্দাবস্থার প্রভাব পড়েছে দেশের বহুজাতিক ব্যাংকগুলোর ঋণে।
সিটি ব্যাংকএনএ বাংলাদেশ কার্যক্রমের মুনাফা গত বছর কমে দাঁড়িয়েছে ৩২৮ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে ছিল ৩৮৪ কোটি টাকা।
স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ২০২৪ সালে ২৩০ কোটি টাকা মুনাফা করলেও গত বছর কমে হয় ২০৭ কোটি টাকা।
হাবিব ব্যাংক ২০২৫ সালে মুনাফা করে ১৮ কোটি টাকা, ২০২৪ সালে যা ছিল ২৪ কোটি টাকা।
বৈশ্বিক সেবাকে দ্রুত ধারণ করায় ভালো করপোরেটরা এসব ব্যাংকের গ্রাহক।
এ ছাড়া ধনী ও উচ্চ শ্রেণির মানুষ এসব ব্যাংকের আস্থাভাজন গ্রাহক।
সূত্র: প্রথম আলো



















