প্রতিনিধি 9 August 2026 , 10:51:48 প্রিন্ট সংস্করণ

সময়টা ১৯৩৭ সাল। ওই সময়কে ধরা হয় হলিউডের স্বর্ণযুগ। সেই যুগে ঘটে যায় ভয়ানক ঘটনা। একদিকে রুপালি পর্দার ঝলমলে আলো, অন্যদিকে সেই আলোর আড়ালে চাপা পড়ে থাকে এক অভিনেত্রী ও ড্যান্সারের আর্তনাদ। যে ঘটনা এখনো হলিউডের কালো অধ্যায়কে সামনে আনে। ভুক্তভোগী সেই নারী ছিলেন নৃত্যশিল্পী ও চলচ্চিত্রের এক্সট্রা চরিত্রের অভিনয়শিল্পী প্যাট্রিসিয়া ডগলাস। ১৯১৭ সালে জন্ম নেওয়া প্যাট্রিসিয়ার বয়স তখন ছিল মাত্র ২০ বছর। তিনি ধর্ষণের যে অভিযোগ তোলেন, তা ছিল সেই সময়ে সবচেয়ে সাহসী কাজ। কারণ, ধর্ষণের অভিযোগ তখনো সেভাবে কেউ করেনি। এই ধর্ষণের অভিযোগ তোলার সাহসই তাঁর কাল হয়েছিল। তিনি শেষ পর্যন্ত বিচারের বদলে পেয়েছিলেন অপমান, চরিত্রহীনের উল্টো অভিযোগ। একসময় তাঁর ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়।

বিখ্যাত স্টুডিও মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ার (এমজিএম) ১৯৩৭ সালে আয়োজন করে একটি করপোরেট পার্টির। সেখানে অতিথিদের বিনোদন দিতে আরও অনেক নারীর সঙ্গে নিয়োগ পান প্যাট্রিসিয়া ডগলাস। তাঁদের কাজ ছিল অতিথিদের সামনে নাচা। কিন্তু সেখানেই ঘটে যায় অঘটন। প্যাট্রিসিয়ার ভাষ্যমতে, পার্টিতে তাঁকে জোর করে মদ পান করানো হয়। পরে তিনি অসুস্থ বোধ করলে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তখন এমজিএমের বিক্রয় বিভাগের কর্মী ডেভিড রজ তাঁকে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করেন। ঘটনার পরপরই প্যাট্রিসিয়া হাসপাতালে যান, চিকিৎসা নেন এবং পুলিশের কাছে অভিযোগও করেন। এমনকি মামলার আইনি খরচও নিজের পকেট থেকেই বহন করেন তিনি।
এদিকে এমন অভিযোগের পরই শুরু হয় পাল্টা আক্রমণ। প্যাট্রিসিয়ার দাবি, ঘটনার প্রমাণ সংরক্ষণের বদলে হাসপাতালে তাঁর শরীর পরিষ্কার করে দেওয়া হয়, ফলে গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়। সেই সময়ে অভিযোগ করার পরে তিনি সংবাদমাধ্যমের রোষানলে পড়েন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁকে উচ্ছৃঙ্খল ও চরিত্রহীন হিসেবে তুলে ধরা হয়। এমনকি তাঁর যৌনরোগ রয়েছে—এমন দাবিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মামলার অভিযোগ প্রত্যাহারের বিনিময়ে প্রসিকিউটর ঘুষ নিয়েছেন বলেও সে সময় অভিযোগ উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত মামলাটি আর এগোয়নি। এই ঘটনার পর কার্যত হলিউডে আর কাজ পাননি প্যাট্রিসিয়া ডগলাস। অনেক গবেষক মনে করেন, তাঁকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘ব্ল্যাক লিস্ট’–এর তালিকায় রাখা হয়েছিল, ফলে তাঁর অভিনয়জীবন প্রায় শেষ হয়ে যায়।
দীর্ঘ সময় তিনি জনসমক্ষে এ বিষয়ে কথা বলেননি, কারণ ক্ষমতার কাছে তিনি হেরে গিয়েছিলেন। ঘটনার কয়েক দশক পেরিয়ে যাওয়ার পর পরিচালক ও লেখক ডেভিড স্টেন প্যাট্রিসিয়াকে খুঁজে বের করেন। মৃত্যুর আগে তিনি পুরো ঘটনার বর্ণনা দেন, যা ভ্যানিটি ফেয়ার-এ প্রকাশিত হয়। ২০০৩ সালে মারা যাওয়ার পর তাঁর সাক্ষাৎকারটি ২০০৭ সালে ‘গার্ল ২৭’ নামক তথ্যচিত্র আকারে প্রকাশ পায়। তিনি ছিলেন হলিউডের ২৭ নম্বর তালিকাভুক্ত এক্সট্রা চরিত্রের অভিনেত্রী। এই তথ্যচিত্রের ট্যাগ লাইন ছিল ‘৭০ বছর, টাকা এবং ক্ষমতা সত্যকে চাপা দিয়ে রেখেছিল।’ এটি সানড্যান্স চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসা পায় এবং অভিনেত্রী রোজ ম্যাকগাওয়ান ও জেসিকা চ্যাস্টেইন এর ভূয়সী প্রশংসা করেন। রোজ ম্যাকগাওয়ান আরও অভিযোগ করেন, যে খামারবাড়িতে সেই পার্টির আয়োজন হয়েছিল, সেখানে আরও নারীরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।
তথ্যচিত্রে দেখানো হয়, প্যাট্রিসিয়া ডগলাসের মামলা শেষ পর্যন্ত আদালতে বিচার পায়নি। কিন্তু ইতিহাসে এটি এমন এক ঘটনার প্রতীক হয়ে আছে, যেখানে একজন নারী অভিযোগ করেছিলেন, অথচ বিচারের বদলে তাকেই অভিযুক্ত বানানো হয়েছিল। হলিউডের ঝলমলে ইতিহাসের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা এই ঘটনাকে আজ অনেক গবেষক ও চলচ্চিত্র-ইতিহাসবিদ ক্ষমতার অপব্যবহার, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক চাপের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এক ঘণ্টা ২৬ মিনিটের ‘গার্ল ২৭’ তথ্যচিত্রে হলিউডের শুরুর যুগে নারীদের প্রতি যৌন নির্যাতনের সংস্কৃতির অজানা ইতিহাস জানা যায়। প্যাট্রিসিয়ার এই লড়াই আজও সেই অন্ধকার সময়ের এক জ্বলন্ত দলিল হয়ে আছে।
নতুন করে আলোচনায় প্যাট্রিসিয়া ডগলাসের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছিল, ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা কতটা কঠিন ছিল।
কীভাবে এই ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, সেটা নিয়ে চলে তর্কবিতর্ক।
একই সঙ্গে এই অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ পায়।
শুরুতে নতুন করে আর ঘটনাগুলো নিয়ে মুখ খুলতে চাননি।
তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বা আইনি প্রক্রিয়া আর সামনে আসেনি।
সূত্র: প্রথম আলো



















